Saturday, 22 October 2022

কবিতা -- ফিরিয়ে দাও--সৌদামিনী শম্পা


কবিতা -- 

ফিরিয়ে দাও
সৌদামিনী শম্পা 

ছেড়ে এসেছি দিনগুলো অতীতের ছায়ামাখা পথে।
শান্ত শীতল দিন, ঝড়হীন, দোলাচলহীন,
বড় অমলীন সে দিনের স্নেহমাখা কোণ!

রোদ ছিল না তো, ছিল না তো হিসেবের খাতা।
বাল্য, কৈশোর, বড় মায়াময়!
মায়ের আঁচল ছিল, নির্ভার মন ও মনন!

কবে হবো বড় বাবার মতন, অথবা কোনো এক বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব্য।
প্রাপ্তির ভাঁড়ার হবে না জানি কত রত্নভারাক্রান্ত!
কিন্তু হায়! সব ভুল, ভাঁড়ারে বেড়েই চলে, বিনাশ স্থাপন!

ফিরে যদি দাও, তবে দিও মায়ের আঁচল !
ফিরে যদি দাও দিও বাবার ছায়া!
ফিরে যদি দাও, দিও নির্মল মন, ঠিক শিশুর মতন।

Tuesday, 18 October 2022

গল্প --সপ্ন যখন সত্য হয়--সামিমা ইয়াসমিন



গল্প --

সপ্ন যখন সত্য হয়
সামিমা ইয়াসমিন 

গল্পটি শুরু হয় তানিয়া নামে একটি মেয়ের নেতৃত্ব দিয়ে যে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি ভালো কলেজে পড়ে। আর এই কলেজে অনেক ধনী ঘরের ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। কিন্তু খুবই কম ছাত্র-ছাত্রী আছে যারা গরীব ঘরের তবে তারা স্কলারশিপ এর মাধ্যমে এই কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। আর তাদেরই মধ্যে তানিয়া হলো একজন।

তার বাবা একটি কোম্পানিতে শ্রমিকের কাজ করে এবং মা গৃহকর্ত্রী। পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে খুব কষ্টে তাদের পারিবারিক জীবন যাপন চলে। এমনকি তানিয়া নিজে একটি কেকের দোকানে কাজ করে যাতে করে তার পড়াশোনার খরচা তুলতে পারে এবং তাদের পারিবারিক আর্থিক সমস্যা দূর করতে পারে। তবুও তাদের এই দারিদ্রতা দূর হয় না। তার একটি ছোট ভাইও আছে, হামিদ। সে এখন ক্লাস টেনে পড়ে। তার ছোট থেকে একটা ইচ্ছা আছে যে সে বড় হয়ে একজন রিপোর্টার হবে । কিন্তু সে তার দিদির মত অতটা পড়াশোনাতে ভালো নয় তাই সে ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ পাইনি। কিন্তু তানিয়া ছোট থেকে মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে সে বড় হয়ে একজন লেখিকা হবে। আর ছোট থেকেই তার এই লেখার অভ্যাস টি তাকে আরও উদ্যোগী করে তুলেছে।  যখন সে একা কোথাও বসে থাকে তখন সে শুধু ভাবে আর তার মনের কথা কলমের দ্বারা খাতায় প্রকাশিত হয়।

উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর  কলেজে ভর্তি হয়েছিল কিন্তু তখন চারিদিকে করোনা ভাইরাসের মহামারী ছড়িয়ে পড়ার কারণে কয়েক মাস লকডাউন ছিল। সরকারের তরফ থেকে বাড়ির বাইরে বেরোনো নিষেধ ছিল তাই সে বছর পড়াশোনাটাও খুব ভালো হয়নি। কিন্তু অনলাইনে পরীক্ষা হওয়ার কারণে বেশিরভাগ সবাই পাস করে গেছে। তবে এখনো পর্যন্ত ফার্স্ট সেমিস্টারের রেজাল্ট বের হয়নি। আর সরকার থেকে রীতিমতো সবাইকে ভ্যাকসিন দেওয়ার কারণে করোনা ভাইরাসের মহামারী আপতত দূর হয় এবং স্কুল-কলেজ সব খুলে দেয়। তারপর রীতিমতো পড়াশোনা শুরু হয় তানিয়াদের ও কলেজ খুলে দেয় এবং কলেজ থেকে একটা নোটিশ দেয় তাতে লেখা থাকে —
“ এতদ্বারা কলেজের সকল ছাত্র-ছাত্রীদের জানানো হচ্ছে যে, বিগত দুবছর ধরে অতিমহামারীর সংকট কাটিয়ে মহাবিদ্যালয়ের নিয়মিত পঠন-পাঠন বর্তমানে অনেকটা স্বাভাবিক হওয়ার পূর্বের ন্যায় বর্তমান ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে কলেজের বার্ষিক পত্রিকা ‘নবাঙকুর’ প্রকাশ করা সম্ভব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পত্রিকার জন্য সকলকে নিম্নলিখিত বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় লেখা জমা দেবার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

বাংলা ভাষায় লেখা যেকোনো ধরনের রচনায় আকাদেমি বানান বিধি অনুসরণ করতে হবে এবং লেখার শেষে নিজ স্বাক্ষর দিতে হবে। লেখার মধ্যে কোনরকম নকল থাকলে বা কারো লেখা হুবহু তুলে এনে জমা দেওয়া হবে যাবে না। কেবলমাত্র উপযুক্ত লেখাগুলি পত্রিকায় প্রকাশিত হবে। পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা গুলির মধ্যে তিনটি বাছাই করা লেখার রচয়িতাদের পুরস্কার প্রদান করা হবে বলেও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। লেখা জমা দেবার শেষ তারিখ ১৫ ই এপ্রিল ২০২২। ”

তানিয়া এ ব্যাপারে খবর পাই যে কলেজে নোটিশ দিয়েছে কিন্তু কী নোটিশ দিয়েছে তা জানেনা। সে রোজকার মতো সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং ব্রেকফাস্ট করে কলেজের ইউনিফর্ম পড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর সবার প্রথমে কেকের দোকানে গিয়ে তিন ঘন্টা দোকান সামলায়। তারপর কলেজ যায়। দোকানের মালিক তানিয়াকে তার নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসে। তাই তাদের মধ্যে সম্পর্কটি বেশ ভালোই আছে।


আজকে নোটিশ দেওয়ার খবর শুনে সে একটু তাড়াতাড়ি দোকান থেকে বেরিয়ে পরে । তারপর কলেজে গিয়ে সে দেখে যেখানে নোটিশ টাঙানো রয়েছে সেখানে অনেক ভিড় লেগে আছে এবং সে কলেজের ছাত্র- ছাত্রীদের মধ্যে ঘেঁষাঘেঁষি তে নোটিশটি পরে। নোটিশটি পড়ে তার মনে একটা আসা জাগ্রত হয় এবং মনে মনে ভাবে সে তিনজনের মধ্যে একজন হবে যাদের পুরস্কার দেওয়া হবে। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ যেন তাকে ব্যঙ্গ করে বলে “তুই এটার স্বপ্ন দেখিস না, তোর জন্য এই পুরস্কারটা নয়” কথাটা শুনে তার মনে একটু দুঃখ হলো তবুও সে কারো কথায় কোন কান না দিয়ে নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখল ।

৩ নং রুমে ইংরেজি অনার্স এর অপর্না ম্যামের ক্লাস হচ্ছে। ক্লাসে ম্যামও নোটিশটির ব্যাপারে আলোচনা করল। ক্লাসে বসে তানিয়া ভাবছে সে কী বিষয়ে গল্প লিখবে এবং সে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পরে। কিছুক্ষণ পরে ম্যামের আওয়াজে তার অন্যমনস্কতা ভাঙলো। “ কী হয়েছে, এত অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছো কেন? ”তানিয়া তখন ঘাবড়ে গিয়ে বলল গল্প লেখার ব্যাপারে ভাবছিলাম । এ কথাটি শুনে পাশে ছাত্রছাত্রীরা তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করতে শুরু করলো । তারপর ম্যামের বকুনিতে সবাই চুপ করল এবং বলল— "গল্প লিখবে ঠিক আছে কিন্তু এত অন্যমনস্ক হয়ে পড়লে হবে না। তুমি একটু বেশিই ভাবো, ঠিক আছে বসে পর।"

ক্লাস শেষ হবার ঘন্টা পড়ল এবং ম্যাম ক্লাস থেকে বেরিয়ে পড়ল আর সে তখনও ভাবছে সে কী লিখবে । আজ পর্যন্ত সে বিভিন্ন রকম গল্প লিখে এসেছে এবং সেগুলির মধ্যে বেশিরভাগই প্রেমের কাহিনী তবে এখন সে আলাদা ধরনের লিখতে চায়।


কলেজ ছুটি হল এবং তাকে তার বান্ধবী পিছন থেকে ডাকছে । তার নাম জিনিয়া কিন্তু সে বাংলা অনার্স নিয়ে পড়ে । ছুটতে ছুটতে এসে বলল “ কলেজের পাশে একটি বই মেলা বসেছে চল গিয়ে দেখে আসি ”। তারা দুজনে বই মেলায় গেল । মেলা ঢোকার প্রবেশ দরজায় লেখা আছে ‘ সাগরদিঘী বইমেলা ’ । আর সেই মেলায় বিভিন্ন রকমের বইয়ের দোকান আছে এবং একটা দোকানে এক এক রকমের বই আছে। কোনোটা ভূতের গল্পের বই আবার কোনোটা হাসির গল্প , প্রেমের গল্প ইত্যাদি। তানিয়া একটি বই কিনল। সেটিতে প্রেমের কাহিনী লেখা আছে কারণ সে প্রেমের গল্প পড়তে খুব পছন্দ করে। আর জিনিয়া একটি ভূতের গল্পের বই কিনল কারণ সে বাড়ীতে বেশীরভাগ সময় ভূতের সিনেমা দেখে । তারপর তারা দুজনে ফুচকার দোকানে গিয়ে ফুচকা খেল। তখন জিনিয়ার মোবাইলে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এলো এবং সেই ফোনটি কেটে দিয়ে মোবাইলটি সুইচ অফ করে দিল। তার মোবাইলে প্রায় অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসে এবং তাকে বিরক্ত করে। কিন্তু  তাদের কাউকে পাত্তা দেয় না কারণ সে আগে থেকেই রিলেশনশিপে আছে । অন্যদিকে তানিয়াকে অনেকজনই প্রপোজ করেছে কিন্তু তাদের কাউকেই সে পাত্তা দেয়নি কারণ এসবের জন্য তার সময় নেই । আর তার এই ভাঙ্গা মোবাইলে কেই বা ফোন করবে । কারণ সে এতটাই গরীব যে মোবাইল ঠিক করার জন্য তা কাছে টাকা নেই । তাই তার মোবাইল শুধু বারে বারে সুইচঅফ হয়ে যায়।

মেলা দেখার পর তারা দুজনে বাড়ি চলে যায়। জিনিয়া আর তানিয়ার বাড়ি একই দিকে নয় তাই তারা বিপরীত দিকে চলে যায়। বাড়ি আসার পথে তানিয়া মনে মনে ভাবে সে কত গরিব ,তাকে শুধু টাকার জন্য কাজ খুঁজে বেড়াতে হয় আবার তাকে পড়াশোনাও করতে হয় । তার জীবন শুধু দুঃখে পরিপূর্ণ।

তারপর সে বাড়ি আসার পরে অন্যমনস্ক হয়ে কিছু কথা না বলে সোজা ঘরে ঢুকে যায়। মা দেখে আশ্চর্য হয় এবং তাকে খাওয়ার জন্য ডাকে। সে হাত মুখ ধোয়ার পর খেতে বসে । তার মা বলেন “ কী হয়েছে ,কি ব্যাপার চুপচাপ আছিস কেন ? অন্যদিন তো খুব বকিস ”। সে মাকে নোটিশটির  ব্যাপারে সব কথা বলল। শোনার পর মা তাকে বললো “ তোকে কারো কথায় কোন কান দিতে হবে না তুই শুধু নিজের উপরে বিশ্বাস রাখ ,আমি জানি তুই পারবি ”। তখনই মনে মনে ঠিক করে ফেলল সে কি গল্প লিখবে এবং সে তারই জীবন কাহিনী নিয়ে একটা গল্প লিখল।

আজ রবিবার ,কলেজ ছুটি। তাই সে দুপুরবেলায় ঘরে বসে তার লেখা গল্পটি বারে বারে পড়ছে এবং মাঝে মাঝে একটু লজ্জা বোধ করছে। সে ভাবছে তার গল্পটা শুনে কেউ আবার হাসবে না তো! যদি এ ব্যাপারটা অতটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও গল্পের শিরোনাম দেওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে এখনও ঠিক করতে পারেনি যে গল্পটির কী শিরোনাম দেবে। এবং সে এটা নিয়ে অনেক সমস্যায় পড়ে গেছে।

যাইহোক ,গল্পের শিরোনাম নিয়ে যে সমস্যাটি ছিল সেটি দূর হয়ে গিয়েছে কারণ সে ঠিক করে ফেলেছে কী শিরোনাম দেবে। তারপর সে সেটি কলেজে জমা দিয়েছে।

আর কয়েকদিন পর সেই তিনজনের নাম ঘোষণা করবে যাদের লেখা সবথেকে সুন্দর হয়েছে। দিন গোনা শেষ হলো এবং তিনজনের নাম ঘোষণা করা হলো। সেই তিনজনের মধ্যে তার নামও ছিল।

এইসব শুনে তার তো খুশির সীমা নেই। তার সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়। যে পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল সেটি বাড়ির সবার হাতে হাতে ঘোরে এবং একবার করে বলে ,বাঃ চমৎকার লিখেছে তো !
পত্রিকার সুচিপত্রে নামও ছিল। ছোটবেলা ( গল্প )তানিয়া সুলতানা।

আর তানিয়া এবং বাকি দু'জনকে কলেজ কর্তৃক পুরস্কার দেওয়া হল তাদের মধ্যে একজনের নাম ছিল রহিম মণ্ডল এবং আরেকজন সৌমিত্র চক্রবর্তী।

                         সামিমা ইয়াসমিন 

কবিতা --আয় কমলা আয় বিমলা শ্রীকান্ত মাহাত

কবিতা --

আয় কমলা আয় বিমলা
       শ্রীকান্ত মাহাত 


আয় কমলা আয় বিমলা
    নদীতে স্নান করি।
নদীর জলে অবগাহন
   আমরা জলপরী।
দুই পাড়েতে বন বিথীকা
    মাঝে বালুর চর।
বালুর চরে খেলবো মোরা
       বেলা দুই প্রহর।
খিদে লাগলে খাবো আমরা
      গাছের পাকা ফল।
বাড়িতে আছে দাদু দিদিমা
      আশায় আছে বল।
গামছা দিয়ে মাছ ধরবো
   সাঁঝে হবেক ঝোল।
খাবার খেয়ে শুয়ে পড়বো
     বোল  হরি বোল।

গল্প --অবশেষে সে আমার প্রেমিকা--শাবলু শাহাবউদ্দিন


গল্প --

অবশেষে সে আমার প্রেমিকা--
শাবলু শাহাবউদ্দিন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শেষ করে চড়ে বসলাম কুষ্টিয়া-ঝিনাইদাহগামী একটা বাসে। আমার সাথে আমার বন্ধু শুফম আছে। সে নিয়মিত বাসের জানালার পাশে বসে। তাই বাধ্য হয়ে বাসের ভিতরের সিটে বসতে হল আমার। দু'জনের-ই মন খারাপ। এত টাকা খরচ করে কোচিং করলাম, অথচ পরীক্ষায় ভালো করতে পাড়লাম না। আমি নিশ্চিত আমরা চান্স পাচ্ছি না। 
বাসের মধ্যেই আমার বন্ধু আবার বই নিয়ে পড়তে বসলো। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে, যে করেই হোক চান্স পেতে হবে। আমিও বই নিয়ে পড়তে বসলাম। কী পড়বো! সব তো মুখস্থ। কিন্তু কনফিউশনের জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ভালো করতে পারি নি। বই রেখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম। পড়তে মন বসছে না। হঠাৎ আমার পাশে অপজিট সিটে বসা মেয়েটির চোখ চোখ পরে গেলো আমার। সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে সামনের দিকে তাকালাম আমি। কিন্তু অন্য দিকে কিছু সময় পরে আমার মন আমাকে বলছে, মুতালেব আবার তাকা। আমি আবার তাকালাম। আবার মেয়েটির চোখ চোখ পরে গেলো। আমি আবারো চোখ ফিরিয়ে নিলাম। নিজে নিজেই লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম। বুকের মধ্যে দরফর দরফর করতে লাগলো। হাটবিট বেড়ে গেলো। আমি ভয়ে ভয়ে আবার তাকালাম। দেখি মেয়েটি অন্য দিকে চেয়ে আছে। আমার দিকে সে অনেক সময় পর একবার তাকালো। এবার মেয়েটি নিজেই মুখ ফিরিয়ে নিল। আমি ওর দিয়ে একপলকে চেয়ে আছি। চোখ অন্য কোন দিকে ঘুরিয়ে নিচ্ছি না। মেয়েটি মাঝে মাঝেই আমার দিকে তাকাচ্ছে এবং চক্ষুলজ্জায় সে বার বার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু আমাকে হতাশ করছে না। আমাদের বাস যখন ঈশ্বরদীর পাকশী লালন শাহ ব্রিজের উপর তখন মেয়েটি আমার দিকে অনেক সময় ধরে চেয়ে আছে। সবাই চেয়ে আছে পদ্মার দিকে, হাডিং ব্রিজের দিকে। শুধু আমি চেয়ে আছি ঐ মেয়েটির দিকে আর মেয়েটি চেয়ে আছে আমার দিকে। হঠাৎ ওর ডানে বসে থাকা বৃদ্ধ মানুষটি কেমনে যেন বুঝে গেলো আমাদের মধ্যে কিছু একটা চলছে। বৃদ্ধ মানুষটি সিট পরিবর্তন করলো। বৃদ্ধ মেয়েটিকে উঠিয়ে জানালার দিকে বসিয়ে দিয়ে, সে মেয়েটির সিটে বসে আমার দিয়ে চেয়ে রইলো। আমি যখনই ঐ দিকে তাকাই তখনই দেখি বৃদ্ধ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এ কী মুশকিলে পড়ে গেলাম।  অবশেষে বাধ্য হয়ে  আমি আমার বন্ধু শুফমকে বললাম, "দেখতো বন্ধু, বৃদ্ধ আমার দিকে তাকিয়ে আছে কী না।" বন্ধু  বললো, হমম। আমি যতবার বললাম বন্ধু ততবার বললো, হমম চেয়ে আছে তোর দিকে। আমি আর ভয়ে তাকালাম না। 
বাসের হেল্পার ডাকতে লাগলো ভার্সিটি গেট। ভার্সিটি গেট, আপনারা নামেন।
নামার সময় কেবলি একবার মেয়েটির দিকে তাকিয়েছি। ওমনি বৃদ্ধ মানুষটি আমার দিকে তেড়ে এলো। আর বললো, "এ দিকে কী। হুম, এ দিকে কী। আবার তাকালে চোখ উপরে নিব।"
চক্ষুলজ্জায়, আমার প্রাণ যেন যায় যায় অবস্থা। ভার্সিটির গেট থেকে সরে যেন সময় পাই নি আমি। দুই বন্ধু দৌড়াতে দৌড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝখানে চলে গেলাম। বন্ধু শুফম, আমাকে রাগাইতে লাগলো, "এ দিকে কী। হুম এ দিকে কী।" বলে।
২.
পরের দিন পরীক্ষার হলে বসে আছি। আমার ডানে একটা সিট ফাঁকা আছে। পরীক্ষা আর মাত্র মিনিট দশেক দেরি আছে। আমাদের উত্তর পত্র দিয়ে দিছে। ঠিক ভাবে নাম রোল পূরণ করার জন্য। আমার অন্য কোন দিকে মন নেই। মনযোগ দিয়ে পূরণ করছি। হঠাৎ একটি মেয়ের কণ্ঠ পেলাম। একটু যেতে দিবেন ভাই, ঐ সিট টি আমার। আমি মেয়েটির দিকে না তাকিয়ে পথ ক্লিয়ার করে দিলাম। মেয়েটি সিটে গিয়ে বসলো। কিন্তু আমি ততটা ভ্রুক্ষেপ করলাম না। আপন মনে বৃত্ত ভরাট করছি। টাইম হয়ে গেছে। প্রশ্নও পেলাম। প্রশ্ন পড়ে পড়ে আবারো বৃত্ত ভরাট করছি। এক ঘন্টা টাইম। আশিটা বৃত্ত। পঞ্চান্নটি দাগিয়েছি। আর পারছি না। দাগালেই ভুল হবে। সময়ও আছে আরো তের মিনিট। বাম দিকের ছেলেকে দুইটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলাম। ও বললো পাড়ি না। আমাকেও ঐ ছেলে পরে দুইটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলো। আমিও রাগে রাগে বললাম পারি না। আর মিনিট দশেক সময় আছে। অবশেষে আমার ডানে বসা মেয়েটির দিকে তাকালাম। ও মা এ কী! তুমি? বাসের সেই মেয়ে আমার ডানে বসে আছে অথচ আমি ওর দিকে এবারও তাকাই নাই। না তাকিয়ে ভালোই হয়েছে। পরীক্ষা ভালো করেছি। ওর দিকে তাকালে আল্লাহ্ জানে কী হত!
মেয়েটি খুব করুন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। আমি বুঝতে পারলাম। ওর প্রশ্ন কমন পড়ে নাই। বললাম, তোমার প্রশ্ন এবং  উত্তর পত্র আমাকে দেও। আর আমার টা তুমি নেও।
মেয়েটি বললো, "যদি ধরা পরি?"
রাখো তোমার ধরা পড়া। আমি ওর টা নিয়ে, খুব দ্রুত উত্তর পত্রের বৃত্ত ভরাট করতে লেগে গেলাম। আমার মনে হল দশ মিনিটে কম করে হলেও প্রায় ত্রিশটি বৃত্ত ভরাট করে দিলাম।
উত্তরপত্র জমা দিয়ে ও মন খারাপ করে চলে যাচ্ছিল। আমি ওর পিছু পিছু এলাম। কথা বললাম। কথায় কথায় জানতে পারলাম ঐ বৃদ্ধ নাকি ওর বাবা। ওর রোল নাম্বার নিলাম। ওর মোবাইল নাম্বার চাইলাম। ও দিলো। তারপরে যখন আমি ওর Facebook ID চাইবো তখন সামনে তাকিয়ে দেখি ঐ বৃদ্ধ হরকাবানের মত আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। কিসের FB ID. আমি পালিয়ে সময় পাই। চোখের পলকে পালিয়ে গেলাম। 
অবশেষে দশ দিন পরে রেজাল্ট পাবলিশ হল। প্রথমে আমি ওর রোল ধরে রেজাল্ট দেখতে লাগলাম। ও দেখি দশম হয়েছে। আমি ওর রেজাল্ট দেখে উকে কল দিলাম। নাম্বার টা ভুল দেখাচ্ছে। তার মানে আমি দশটা নাম্বার তুলে ছিলাম। একটা ডিজিট কম আছে।
মন খারাপ করে নিজের রেজাল্ট দেখলাম। আমি একশত সাত নাম্বারে আছি।
৩.
পরের সপ্তাহে, ভাইভা। আমি ভাইভা দিতে গিয়ে নোটিশ বোর্ডে সন্ধান নিলাম। দেখি ওর ভাইভা যেখানে তার আগের রুমে আমার ভাইভা বোর্ড। আমি সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে ওর সন্ধান করছি।ওদের কেবল তিন নাম্বার পর্যন্ত ডেকেছে। কিন্তু ও সিরিয়ালে দাঁড়ায় নাই। আমার কেমন যেন লাগছিল। মনে মনে ভাবছিলাম। ও যদি ভাইভা দিতে না আসে তাহলে আমিও এখানে ভর্তি হবো না। এলাকার কলেজেই অনার্স করবো। আমাদের ভাইভা বোর্ডে আমার সিরিয়াল সাত। আমার ডাক এলো। আমি ভাইভা দিয়ে বের হচ্ছি আর ওদের সিরিয়ালের দিকে তাকিয়ে আছি যে, দেখি ও আসছে কী না। তবুও দেখচ্ছি ও সিরিয়ালে দাঁড়ায় নাই। ওদের সিরিয়ালে। দশম বলে কে যেন ডাকছে। সেই সময় মনে হল কে যেন পিছন থেকে ছুটে এসে আমাকে ধাক্কা মেরে দিলো। ধাক্কা লেগে ওর কাগজপাত্রের ফাইল ছুটে গেলো। পিছন ফিরে কেবলি গালি দেবো। ওমনি দেখি, এ আর কেউ না, আমার সেই মেয়েটি। আমি তখন জোরে করে রেসপন্স করলাম। দশম আছি। এবং ওর ছুটে পড়া ফাইল উঠি দিয়ে ভাইভার রুম অবধি এগিয়ে দিলাম। ভাইভা শেষ করে ও রুম থেকে বের হল। আমাকে দেখে ও মহা খুশি। অবশেষে ওর থেকে সঠিক নাম্বার আর FB ID পেলাম।
৪.
ভাইভা শেষে, পনেরো দিন পরে আমাদের ভর্তির তারিখ নির্ধারিত হল। আমার এলো লোকপ্রশাসন। ওর এলো ইংরেজি। আমার ভীষণ মন খারাপ হল। হয় তো ও আমার সাথে সম্পর্ক রাখবে না। কারণ ওর সাবজেক্ট ভালো। কিন্তু না। ভর্তি হবার পরে দেখি, ও আমাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। ক্লাস টাইম আর ঘুমের টাইম বাদে সব সময় ও আর আমি একসাথে। কখনো লেকের পারে। কখনো প্রশাসনিক ভবনের সামনে। কখনো রবীন্দ্রনাথ বাড়ি। কখনো লালনের মাঝারে। সব সময় একসাথে। একটি ভালো কাপল হিসেবে সবার সামনে মুখ পরিচিত হয়ে উঠলাম আমরা। ছয় মাস যেতে না যেতেই হঠাৎ একদিন, ও উধাও। এক'দিন, দু'দিন চলে যায় আমি ওর সন্ধান পাই না। ফোন, FB সব বন্ধ ওর। ঘটনা কী! অবশেষে ওর ডিপার্টমেন্টের বন্ধুদের নিকট খোঁজ নিলাম। তারাও বলতে পারে না। সাত দিন চলে যায়। আমার অবস্থা টাইট। আমি দিশাহারা।
অবশেষে আমার ডিপার্টমেন্টের সবাই জেনে গেলো, আমি ক্লাস করছি না। লেকের পারে বসে সারাদিন সিগারেট খাই। রাতে রুমেও ফিরি না। মাঝে মাঝে নেশাও করি। বিষয়টি শিক্ষকেরা অবধি জেনে গেলো। অবশেষে ২০ দিনের মাথায় শিক্ষকদের মারুফতে জানতে পারলাম, ওর বাবা মারা গেছে। তাই ও এখন নিজের এলাকাতে আছে। ও ক‍্যাম্পাসে কবে আসবে তা কেউ বলতে পারে না। ২৫ দিনের মাথায় ওর বাড়ির ঠিকানা যোগার করলাম; ওদের ডিপার্টমেন্টের অফিস সহকারী নিকট থেকে। ২৬ দিনের দিন রওনা হলাম ওদের বাড়িতে। ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখি কেউ নেই। আমি ওদের ঘরের বারান্দায় গিয়ে বসে রইলাম। একজন দু'জন করে অনেক লোক জড় হয়ে গেলো। ওদের মুখ থেকে শুনতে পেলাম কাসেম প্রধানের পরিচিত কোন এক নাতি আমার বন‍্যাকে বিয়ে করে বিদেশ নিয়ে গেছে আজ থেকে ছয় দিন আগে। বিষয়টি আমি কোন ভাবে মেনে নিতে পারছিলাম না। বন‍্যা বিদেশ যেতে পারে না। কারণ ওর পাসপোর্ট নেই। এত তাড়াতাড়ি এত কিছু কেমনে সম্ভব। আরো জানতে পারলাম ওদের পরিবারের অন‍্যান‍্য সদস্যরা সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক আগেই মারা গেছে। আপন বলতে এই পিতা ছাড়া আর কেউ ছিল না ওর। 
পরিস্থিতি অস্বাভাবিক দেখে অবশেষে কাসেম প্রধান এসে আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন। কাসেম প্রধান এলাকার মোড়ল ও বিশাল রাজনৈতিক নেতা। পুলিশ আমাকে থানায় তুলে নিয়ে গেলো। তারপরের দিন আমার পিতা-মাতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার বিভাগের একজন শিক্ষক খবর পেয়ে থানায় এসে অজ্ঞান অবস্থায়  আমাকে উদ্ধার করেন। তারপরে কতদিন পরে আমার জ্ঞান ফিরে ছিল তা আমার জানা নেই। আমার এই অজ্ঞান অবস্থা নিয়ে বিশাল একটা কাণ্ড ঘটে যায়। থানার ওসি প্রত‍্যাহার হয় এবং কাসেম প্রধান আটক হয়ে জেলে যায়। অথচ আমাকে কেউ কিন্তু ফুলের টুকাও দিছিল না।
.
যাইহোক, আমার পড়াশোনা গ‍্যাপ পড়ে গেল। আমি আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যেতে চাই ছিলাম না। অবশেষে, বাবা-মায়ের অনুরোধে এক বছর গ‍্যাপ দিয়ে আবার প্রথম বর্ষে ক্লাস শুরু করতে বাধ্য হলাম। পড়াশোনা নামে মাত্রা চলতে থাকে। সব সময় সাহিত্যচর্চায় আমি বিভোর। কবিতা আর কবিতা। আমি কবি।
অবশেষে কোন মত করে অনার্স শেষ করলাম।বড় কবি হব বলে ঢাকায় আসলাম। এখানে এসে পড়লাম আরেক বিপদে। কে কারে চেনে। কিসের কবি। কবি এখন ঘরে ঘরে। কোন পত্রিকার অফিস আমারে নিলো না। কেউ নেওয়া তো দূরের কথা। আমাকে মূল‍্যায়ন অবধি করলো না। 
কী আর করার। দিন শেষে, একটা ফুটঅভার ব্রিজের উপর শুয়ে পরলাম। মাঝ রাতে চেতন পেয়ে দেখি আমার গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। পাশ দিয়ে কে যেন যাচ্ছিল। হাত দিয়ে তার পা চেপে ধরে বললাম, আমি বাঁচতে চাই। আমাকে বাঁচান। পা টা খুব নরম মনে হচ্ছিল। কোন এক মেয়ে মানুষের পা হয় তো হবে।
তারপরে কী ঘটেছিল তা আমি বলতে পারবো না। পরের দিন চেতন পেয়ে দেখি আমি একটা হাসপাতালের বেডের উপর শুয়ে আছি। শরীর অনেকটাই সুস্থ। আমি উঠে বসতেই কোন এক নার্স এসে আমাকে বললো, আপনি শুয়ে থাকুন। বিকেলে আপনার স্ত্রী এসে নিয়ে যাবে। 
আমার স্ত্রী? কে সে? নিজেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন আমার আবার বার বার বন‍্যার কথা মনে পরে যাচ্ছিল। বন‍্যার কথা ভাবতে ভাবতে আমি আবার ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুম থেকে জেগে দেখি আমার পাশে একটি মেয়ে বসে আছে। ধীরে ধীরে মেয়েটির মুখের দিকে তাকালাম। মুখের দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠলাম। কে? বন‍্যা, তুমি?
- হমমম, আমি বন‍্যা।
- এত দিন কোথায় ছিলে?
- সে অনেক কথা। পড়ে বলবো। এখন চল বাড়িতে যাই।
- আমাদের বাড়ি কোথায়?
হাসপাতাল থেকে রওনা হলাম। রিকশায় উঠে ও সব বললো। রাতে আমি নাকি ওর পা চেপে ধরে বাঁচতে চেয়ে ছিলাম।
অবশেষে আমি জানতে চাইলাম ওর বিদেশ যাওয়া নিয়ে। ও কিছুই বলতে চাচ্ছিল না। আমার জোড়াজুড়িতে অবশেষে মুখ খুললো। 
কাসেম প্রধান ও ওনার নাতি বিয়ের নাটক সাজিয়ে দোলদিয়ার পতিতলায় উকে বিক্রি করে দিছিল। সেখানে প্রায় দুই বছর ছিল। সেখান থেকে ঢাকার কোন এক হোটেল মালিক তাকে কিনে নিয়ে এসেছে। ওখানে প্রায় আড়াই বছর থাকার পরে আজ দের বছরের মত হল ও মুক্তি পেয়েছে। হোটেল মালিক রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে জেলহাজতে আছে। ওনার সব ব‍্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আপনা আপনি মুক্তি পেয়েছে ও। এখন ও স্বাধীন ভাবে বারে (মদের ক্লাবে) কাজ করে। পাশাপাশি একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করছে। 
আমি সব শুনে উকে বললাম, আমাকে বিয়ে করতে পারবা?
ও আমাকে বললো, বিয়ের কী দরকার! আজীবন আমি তোমার প্রেমিকা হিসেবে থাকতে চাই। রাখবা না?
আমি কিছু না বলে ওর হাসিমাখা উজ্জ্বল মুখের দিকে ফ‍্যালফ‍্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।

কবিতা -- কিছুক্ষণ--অঞ্জলি দে নন্দী, মম

কবিতা -- 

কিছুক্ষণ
অঞ্জলি দে নন্দী, মম

মৃতদেহটির মাথাটা মায়ের কোলে আছে।
যুবক ছেলের দেহ প্রাণহীন।
কিছুক্ষণ বসেছো কি সেই সে মায়ের কাছে?
নিয়তি তো চির ত্রাণহীন।
জীবনের জন্য কোথায় তার দয়া, মায়া?
নিষ্ঠুরতা যে তার দানে নাচে।
কাজ তার স্পন্দনহীন করা কায়া।
ছিঃ নিয়তি! তুই কি নিদারুণ বেহায়া!
বল তো ওরে ও তুই নিলাজ!
পুত্রহারা মা এখন কি করে বাঁচে?
এবার বন্ধ কর তোর সেই সে পুরোনো কুকাজ!
অকালে কাড়িস না আর প্রাণ!
নিতে দে নবপ্রাণকে দীর্ঘ জীবনের ঘ্রাণ!
শোন তুই অতি দীর্ঘ জীবনের হৃদ-আওয়াজ!
ওহে বিশ্ব, তুমি কি চেনো সেই সে অসহায় মাকে?
কিছুক্ষণ কি তুমি শান্তি দিতে পারো সেই সে মাকে?
হয়েও জীবন্ত
যে চিতা সম জ্বলন্ত।
আমি দেখি সেই সে মাকে।
আমিও ডাকি 'মা' বলে যাকে।
আমার খুব কাছের সেই সে পুত্রহারা মা, তাই।
আর সেই সে অকাল-মৃতটি - সেতো 
হ্যাঁ, সে যে আমার নিজ-ছোট-ভাই।
যে প্রতি বছর আমার আঙ্গুল থেকে
চন্দনের ভাইফোঁটা পেতো।
যার কপালে আমি দীর্ঘায়ুর চিহ্ন দিতাম এঁকে।
তবুও আজ আর সেতো
আমাদের এই জীবনের জগতে নাই।
শুধু বেদনার স্মৃতি গেল সে রেখে।
ব্যথার আঁধারে অন্তরে শুধুই খুঁজি তাকে;
যে চিরতরে ছেড়ে যায়, তাকে কি আর পাই!
তবুও আমার ভাইয়ের ব্যথাতুর মাকে
প্রাণপণ চেষ্টায় বাঁচাতে চাই।
আর সে এখনই চিরতরে চলে যেতে চায়
তার আদরের ছেলের কাছে।
হায় হায় হায়!!!
মৃত্যু তো শরীরকে শ্বাসহীন করতে নেয় 
কিছুক্ষণ মাত্র।
সত্যই মৃত্যু, তুই এক চির ঘৃণার পাত্র।


Saturday, 15 October 2022

অণুগল্প -- কণ্যা--চন্দ্রাণী গুপ্ত ব্যানার্জি

অণুগল্প -- 

কণ্যা 
চন্দ্রাণী গুপ্ত ব্যানার্জি
-----------------------------

আজ সদানন্দ পাল মহাশয়ের টালির ঘরে আলো-আঁধারির খেলা। বেশিরভাগটাই আধারে নিমজ্জিত ।সেই ঘরেরই  নিভৃত কোণে একটি প্রদীপ প্রজ্বলিত । আশে-পাশে পড়ে রয়েছে মাটির ডেলা। প্রদীপের সলতে উসকে দিলেন বিপত্নীক সদানন্দবাবু ।বুকের ভেতরটা যেন হাহাকার করে উঠলো ।ঘরটা আজ বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। হৃদয় ফুড়ে কান্নার স্রোত বেরোতে চাইছে। অশ্রুসজল নেত্রে ফাঁকা ঘরটায় কাউকে  অবিরাম খুঁজে চলেছেন। কিন্তু সে যে আজ নেই ।সদানন্দবাবুর ঘর অন্ধকার করে সে আজ অন্যের  গৃহ আলোকিত করছে। বাইরে আলোর রোশনাই। পৃথিবী জুড়ে আনন্দের বান ডেকেছে। সদানন্দবাবু যে আজ আবারো একা হয়ে গেলেন। এতদিন ধরে তিলে তিলে যাকে গড়ে তুলেছিলেন মনের মতো করে তাকে আজ অপরের হাতে তুলে দিতে হলো। কন্যা মৃন্ময়ী এতদিন সদানন্দবাবুর যে ঘর আলো করে ছিল আজ সেই ঘরেই শূন্যতা বিরাজমান। ষষ্ঠীর সন্ধ্যের আকাশে এক ফালি চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। সেই চাঁদের পানেই তাকিয়ে ছিলেন সদানন্দবাবু ।ঘরে হঠাৎ করেই কারো পদধ্বনি যেন শুনতে পেলেন। এ পদধ্বনি  তার বডড চেনা। তার আত্মজা চিন্ময়ীর। চিন্ময়ী জানে এই কটা দিন তার বাবা মনের দুঃখ কষ্ট পাথর চাপা দিয়ে রাখেন । মৃন্ময়ীকে বাবা নিজের কন্যা জ্ঞানে দেখেন। তাই আজ সদানন্দবাবু মৃন্ময়ীর চলে যাওয়ায় ভগ্নহৃদয়। চিন্ময়ী এসে আস্তে করে ডাকে...

 ---"বাবা ..."

সদানন্দ বাবু ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়ের দিকে তাকান। চিন্ময়ী দেখে তার বাবার চোখে জল। শরৎকালে শ্রাবণের বারিধারা বইছে। এ মানুষটি যে কখনো তার দুই কণ্যার মধ্যে ভেদাভেদ করেননি। দুজনকেই ভরিয়ে দিয়েছেন সমান ভালোবাসায় ।সে দেবী হোক কিংবা মানবী।


Wednesday, 12 October 2022

জয়িতা ভট্টাচার্যর গল্প ও কবিতা --

জয়িতা ভট্টাচার্যর গল্প ও কবিতা --

গল্প --
মায়াবউ

ঠক্ ঠক্ ঠক্ ঠক্......
 আওয়াজটা এগিয়ে আসছে।
মায়া পেছন ফিরে বাসন মাজছে কুয়োতলায়।আওয়াজটা তার চেনা।খর রোদ্দুর।বেশি বেলা হয়নি,মোটে এগারোটা, তবু গলা থেকে বুকের ভাঁজ বরাবর ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।রংচটা ব্লাউজের ওপরের বোতাম কবে ছিঁড়ে গেছে।ভারি বুক ভিজে গেছে, কোমরে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
সুনীল এসব দেখে। উঠোনে বসে হাঁফায়।রেশনের চাল তেল সাবান বিস্কুট। চকখড়ির বৃত্তে দান উৎসব।
কাল থেকে ত্রিবর্ণ সঙ্ঘ এক প্যাকেট দুধ দিয়ে যাচ্ছে।মায়া র জন্য।
উঠে দাঁড়াতে কষ্ট।ভারি পেট মায়া তবু ওঠে।আধমাজা বাসন রোদে পোড়ে।
বুকের কাপড়, কোমরের কষি আলগা, মায়া জল বাতাসা নিয়ে আসে।নিজেও গলায় ঢালে ঘটি থেকে অনেকটা জল।বড়ো চেষ্টা।ভাসুর ভাদ্দর বউ তফাতের দিন কবেই মুছে গেছে, যেমন সুনীলের মনেই পড়ে না স্পষ্ট করে এমন একটা খর দিনের কথা।ট্রাকের চাকায় পিষে দিয়েছিল  ডান পা টা।একমাস হাসপাতালে থেকে অনেক দিন পর এক পায়ে কাঠের দণ্ডে ভর করে  দুর্বল কোমরে ঘরে এসেছিল সুনীল।
সেই পা টার কথা মনে পড়ে। ওখানটা বিলকুল ফাঁকা।ইচ্ছে করে সেই হারানো পা টা একবার হাত বোলাতে।টুকরো টুকরো হয়ে পথে পড়ে থাকা তার পা
গরম চাতালে জল ঢালে মায়া,
পেটেরটা আটমাস।বুঁচি , তার বড় মেয়েটা রান্না ঘরের সামনে চাল ধুচ্ছে।ছড় ছড় জল পড়ে নেবুগাছে।নেবু চুষতে ভালো লাগে আজকাল মায়ার।
মানুষটার ওপর রাগ হয়।দুবছর হলো এই গ্রামের পঁচিশটো  লোক মিলে কোথায় যেন রাজমিস্ত্রির কাজ নিয়ে চলে গেল, অনেক দূরে কী জানি কোথায়। 
দিল্লি থেকে নাকি আরো সাত ঘন্টা।
গেলোবার এসে রাতে এমন দস্যিপনা করল সারারাত.......মায়ার নাকের ডগায়  ঘাম।--"কী দরকার আর,এট্টা মেয়ে আছে তো।" তা শুনলে তো!।যেকদিন ছিলো তার হাড় মাস এক করে যাবার দিন,গালটা টিপে  বলে গেল এসে ছেলের মুখ দেখব।
"দূর হ ",
আলতো হেসে কাকে যে বলল মায়া, ওই পা পা করে ঘুরে বেড়ানো এক শালিখটাকে না রাতের স্মৃতি,নাকি মানুষটাকেই।
বাবলা গাছের একটু ছায়ায় কটা কাঠবিড়াল খুনসুটি করছে।শুনশান পথঘাট।
তা মানুষটা পারে বটে পরিশ্রম করতে।ছায়া দেখে অল্প উদাস হয়।কেমন আছে কে জানে।হদ্দ পাঁচ দিন ফুন নেই।যাবার আগে দাওয়ায় নতুন করে খড় ছাইলো একা হাতে।
তার জন্য  কাচের চুড়ি,নতুন শাঁখা পলা এক জোড়,পাউডার,ভাস্করের হাতে কিচু টাকাও তো দে গ্যাচে।কত্তব্য কম্ম জানে খুব। 
সুনীল ঘেমো ফতুয়াটা খুলে রাখে।
অনিলের কোনো খবর নেই।তবে একসঙ্গে আছে সবাই।একা তো নয়।
দেশে নাকি মারি লেগেছে।
সে দেশেও।কাল ক্লাবের ছেলেরা বলেছে সব দেশে সব কিচু বন্ধ।গাড়ি ঘোড়া কাজ কারবার সব।লকডাডাউন বলে তাকে।
তালি,অনিলরা ফিরবে কী করে।নাকি সেখেনে থাকবে।
দুপুর বাড়ে।খিদে পায়।ঘরের সামনে মাচা করে পুঁই, লাউ ডগা চরবড়িয়ে বাড়ছে ডগমগে যুবতী র মতো।
লঙ্কা, কটা ঝিঙে আর কুমড়োর গাছ।ওরা সুনীলের পরিবার।চালে ডালে রোজ দুটো একটা গাছের সবজি তো জুটছে।
মনটা খচ্ খচ্ করে।বৌটা পোয়াতি, হাতে বেশি টাকা নেই।অনিলের খবর পাওয়া যায় না।
পুকুর ঘাটে আধজলে মায়া। রোদ উঠেছে টকটকে।ব্লাউজ খুলে দেয়, জলে আরেক ধাপ নেমে গায়ের কাপড়,সায়া।নগ্ন পেটের ওপর ঠাণ্ডা জল ,মানুষটা কবে ফিরবে কে জানে।
একডুব,দুই ডুব তিন ডুব,মনে মনে বলে ঠাকুর গো,মানুষটার মান রেখো একটা ছেলে দিও।
ক্ষিদে পাচ্ছে সুনীলের।ভিজে চুল থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে, খালি গায়ে ভিজে কাপড়,স্পষ্ট করে সব সাজানো।সুনীল অন্ধ হয়ে থাকে।
একটু গড়িয়ে নিতেই সন্ধ্যা এসে যায়। 
অন্ধকারে প্রদীপ জ্বেলে শাঁখ বাজায় মায়া।কাচা কাপড়।মোটা করে সিঁদুর।গায়ে, গলায়, বগলে পাউডার।ধূপ আর পাউডারের গন্ধ মিশে যায়।
চা দোকানের পাশের ঘরে টিভি।কত পুলিশ। সব বন্ধ। গাড়ি ট্রেন সব।ওই যে পথে লাইন করে ওরা কারা।মাথায় বস্তা নিয়ে হাঁটছে দলে দলে ওরা।সুনীল পাছা ঘষটে এগিয়ে যায়। প্রাণপন খোঁজে। ওখানেই আছে অনিল।হ্যাঁ,ওরা নাকি হেঁটে হেঁটে ফিরছে যে যার বাড়ি।কাজ গেছে।খাওয়া থাকার জায়গা নেই।কত লোক ,মেয়ে মদ্দ শিশু সব লাইন করে।
পুলিশ লাঠিপেটা করছে।তুলে দিচ্ছে ট্রাকে,কেউ উঠতে পারছে কেউ পড়ে যাচ্ছে।রেল লাইন ধরেও কত লোক।
ওখানেই অনিল আছে কোথাও।পাড়ায় সবাই দোর দিয়েছে।কেউ নেই ।

মায়ার হয়েছে জ্বালা।একঠেঙে মানুষ টা কোথায় পড়ে মরবে,এখনো এলো না,বাইরে ঘুটঘুটে।
--"বলি এত রাত করে যে ফিরলে পড়ে মরলে তোমার ভাইকে কী জবাব দেব।"
টিকটিক করে ডেকে ওঠে টিকটিকিটা।
বুঁচি পুরোনো পড়া করে।ইস্কুল বন্ধ। 
জ্যাঠার কাছে পড়ে অল্প বিস্তর।
রাত বাড়ে।বাইরে বিরাট কালো ছায়ার মতো রাত।ঝোপে ব্যাঙ ডাকছে।ওধারে পগাড় থেকে একটা গন্ধ। কিছু মরেছে বোধহয়। বাতাসে বোঁটকা গন্ধ।
দুজনে মুখোমুখি খায় চুপচাপ।
বলি বলি করে বলেই ফেলে মায়া,
---'' লকডাডাউন কারে বলে দাবাবু,আজ বৈকালে মনসার মা এসেছিল।বলে গেল এখন সরকার লকডাডাউন করেচে সব বন্ধ।তোর মরদ আসবেনি আর একন"
--অনেকটা সময় ধরে ডাঁটা চিবোয়  মাথা নীচু করে সুনীল।নিজেকে গুছিয়ে নেয়।গলা ঝাড়ে।একটু কাশে।পেঁচা ডাকে কর্কশ।
___হুম।একটু চিন্তা হচ্ছে মায়াবউ।লকডাডাউন মানে কেউ পথে বরোবেনা।কল কারখানা, দোকান সব বন্ধ।
---মানুষটা?
---সব ফিরছে।
---ওহ্। মায়া খুশি হয়ে যায়।ফিরছে তার মানুষটা।
সুনীল আর কিছু বলে না।
রাত বাড়ে।তোলা জলে বাসন ধুয়ে,আলো নিবিয়ে দেয়।
মেঝেতে পাটি বিছিয়ে শুয়ে খোঁড়া মানুষটা।মশার ধূপ জ্বালে।
বুঁচি র পাশে তক্তপোশে শুয়ে পড়ে।পেটে হাত বোলায়।অন্ধকারে পেট টা উন্মুক্ত, উঁচু হয়ে উঠেছে।নড়ছে।ওই তো এধার ওধার।এই এক স্বর্গীয় আনন্দ।
ফিরছে বুঁচি র বাপ তবে চিন্তা নেই আর।
ঘুমিয়ে পড়ে মায়া।
সুনীলের ঘুম আসে না।বিপদের গন্ধ।কিছু যেন হবে।পৃথিবীটা,তার ক্ষুদ্র পৃথিবীতে আবার কী যেন হবে।আশংকায় ঘুম আসে না।
দিনের পর দিন এধার ওধার থেকে লোক মরে শহরে।তাদের মফস্বলের বাজারেও নাকি।
খবরে বলে না অনিলের কথা।ঠক্ ঠক্ ঠক্ ঠক্.......বিরামহীন সুনীল 
সারাদিন বিডিও অফিস,পঞ্চায়েত অফিসে বসে থাকে।
কত রকম খবর ওড়ে গরম হাওয়ার সাথে,কত শুকনো পাতা ঝরে।
কত লোক নাকি গাড়ির নীচে চাপা পড়েছে।
বুকটা ধরাক করে ওঠে।না, ওরা বেহারের।ফের চাপা পড়ে কয়জনা ট্রেনের তলায়।কজন বাঙালিও।
   মায়ার আজকাল আলস লাগে।শুতে ইচ্ছে করে।আটমাস হয়ে গেল।ঘুম পায়,ক্ষিদে লাগে খুব।ঘরে খাবার বাড়ন্ত। বিনি পয়সার মোটা চাল আর মটর ডাল,সঙ্গে  উঠোনের লঙ্কা আর ঝিঙে।তাই খায় গোগ্রাসে। 
কী যেন হয়েছে ভাসুরটার।কথা কয় না।চুপ করে বসে থাকে আকাশ পানে চেয়ে।
খুব ঝড় ওঠে সেদিন  রাতে।ঘরে চুপ করে বসে দুটি প্রাণী।উঠোনে মর্ মর্ করে গাছটা উল্টে পড়ল।ঘর সাদা হয়ে কাছেই বাজ পড়ল।
একঠেঙে সুনীলকেই জড়িয়ে ধরে মায়াবউ,বুকের মধ্যে ধরফর।
আর তারপরেই পেট চাড়িয়ে ওঠে তীব্র  বেদনা।দালানের ওপর ছাওয়া চালটা উড়ে গেছে ততক্ষণে।
সুনীলের একটা ঠ্যাং সচল হয়।মায়া গোঙায়।আঝোর বৃষ্টি বাইরে,নিকষ অন্ধকার।সুনীল বাইরে আসে।
----হা ভগবান, একি করলে দয়াময়,
---"একা যেওনি  পড়ে যাবে ঘর থেকে" তবু ক্ষীণ কন্ঠ মায়ার।
রাত হলে সকাল তো হবেই। উঠোনে পড়ে আছে পেয়ারা গাছটা,সারি সারি মরা কাক,শালিখ,চড়ুই,
ভাঙা বাসা।
সে রাতে সুনীলের সঙ্গে  এসেছিল মালা আর আরতি ।যমে মানুষে টানাটানি, মায়াবউ একবার ককিয়ে ওঠে।তারপর সব চুপ।
রাতভর বাইরে বসে কাঁদে সুনীল।

ব্লক অফিসে ডেকেছিল বারো দিন আগে।পরিযায়ী শ্রমিক যারা মারা গেছে ট্রেনের তলায় তাদের ছবি।একের পর এক ছবি।আর তারপর তের নম্বর ছবিটায় অদ্ভুত থেঁতলে যাওয়া শরীরে লাইনে নিথর অনিল।অনিল ঘড়াই। ঠিকাদারের সঙ্গে কাজে যাওয়া অনিল মিস্ত্রির নতুন উপাধি পরিযায়ী শ্রমিক।
সই সাবুদ। ক্ষতিপূরণের  টাকার জন্য মায়া ঘড়াই এর নাম লিখেছিল।কিন্তু  তার হারানো পা টার মতো কথা হারিয়ে গেছিল।পাথরের মতো।
সুনীল  আজও বলতে পারেনি।

ভোরবেলা জন্মেছে হারান।
ওই নামেই ডাকে।এখন হামা দেয় সে দাওয়া আলো করে।
মায়া সিঁদুর পরে।লাল টিপ।হারানের বাপ কাজ করে আনবে অনেক টাকা।ঘর পাকা হয়েছে তার পাঠানো টাকায়।সুনীল বলেছে।সেও তো কথা রেখেছে।

কেবল দুপুর বেলা পুকুর ঘাটে ফর্সা গাছের ডালে একটা কুবোপাখি টেড়িয়ে  টেড়িয়ে দেখে,কী বলতে চায় যেন।
সারি সারি তালগাছ  ছায়া ফেলে কালো জলে।হাওয়া দেয়।ঢেউ খেলে জলে।
মায়াবউ  উদাস হয়ে যায়। বুকের আঁচল খসে যায়। মানুষটা সেই যে গেল আর তো এলোনি?
                        ________

কবিতা --

শরণাগত 

ভরে দিচ্ছ শরীরময় চাঁদ 
আর প্লাবন
  ওগো লীলাময়!
 
এতো সব কানামাছি খেলা
এতো হাহাকার
এতো যে রক্তের দেয়া-নেয়া
শূন্য দুগ্ধপথে ক্ষত বিক্ষত 
একাকী,
 এই লীলাপথে 
তোমারই ছায়া দেখি
তোমারই ছায়া দেখি
ঘাসেতে নদীতে, 
নিজস্ব জঠরে,
আলো আর আঁধারে 
হে লীলাময়!

চুম্বন করিব চরণ তোমার

স্মৃতিশেখর মিত্রের গল্প ও কবিতা --

স্মৃতি শেখর মিত্রের গল্প ও কবিতা -- 
গল্প --

প্রেম

গয়া জেলার চৌপারনে ছত্তীশ যাদবের বাস।
অত্যন্ত পরিশ্রমী ও সৎ মানুষ। গোয়ালা হিসাবে
তার সুনাম রয়েছে ঐ তল্লাটে। গোয়ালাদের
স্বভাবের কোন কিছুই ওর মধ্যে দেখা যায় না।
অন্যান্য গোয়ালাদের ধারণা দুধে জল মেলানো
তাদের জাতির ধর্মের মধ্যেই পড়ে।ঈশ্বরও
সেকথা মেনে নিয়েছেন। যেমন স্যাকরাদের 
কাজ সোনায় খাদ মেশানো নইলে গয়না বানানো যায় না। সেই ছত্তীশ যাদবের বুড়ি
গাইটি শেষ বয়সে একটি এঁড়ে বাছুরের জন্ম
দেয় এবং ছত্তীশ যাদবের শত চেষ্টাতেও
গাইটিকে বাঁচানো সম্ভব হলো না।কন্যা সন্তানের
মতো সে তার বুড়ি গাইটিকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে। শীতের সময় থাকায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় তার তৈরী করা বড় বস্তার ঢাকা বাছুরের ও তার মায়ের শরীরে ঢাকা দিয়ে দেয় যাতে
তাদের ঠান্ডা না লাগে। সারা শরীর ঢেকে দিত
তাছাড়াও ঘুঁটে জ্বালিয়ে গাইটির শরীরে যাতে
গরম ধরে তার চেষ্টা করে। কিন্তু কোন প্রয়াসই তার কাজে এলো না। শেষ বয়সে বাচ্চা বিয়ানোর ধকল সহ্য করতে না পেরে তার মৃত্যু ঘটে।তার মৃত্যুতে ছত্তীশ যাদব কন্যা হারানোর
বেদনা অনুভব করলো।এ সংসারে ছত্তীশের
নিকট আত্মীয় বলতে কেউ নেই। একটি বোন
ছিল তারও বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর একেবারে
একা হয়ে যায়।
বুড়ি গাইটি মারা যাওয়ার পর তার উপর সমস্ত
দায়িত্ব এসে পড়ে সদ্যজাত বাছুরটির। সারাদিন
বাছুরটি হাম্বা হাম্বা স্বরে ডেকে ডেকে মাকে খুঁজে বেড়ায়। ছত্তীশের নরম মনে গভীর বেদনার
সঞ্চার হয়।বাছুরটিকে কীভাবে বড় করা যায় সেই চিন্তায় সে ডুবে থাকে সারাদিন।নেহাৎ বাছুর মায়ের দুধ ছাড়া বাঁচে কেমনে!
তবু সে প্রতিদিন বাছুরটির খাওয়ানোর জন্য
এক পোয়া করে দুধের বন্দোবস্ত করে।গাইটির
বিয়ানোর পর তার আশা ছিল গাইটি থেকে
দোহানোর পর যে দুধ পাওয়া যাবে তাতে তার
নিজের খাওয়া দাওয়ার কিছুটা হলেও সুরাহা হবে কিন্তু হায় এখন তাকে অন্যদের কাছ থেকে
বাছুরকে খাওয়ানোর জন্য দুধের জোগাড় করতে হচ্ছে। ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছত্তীশের মন
যদিও কাতর হয় কখনো কেমনে তবু তার
ঈশ্বরের উপর আস্থা আবার বেড়ে যায়। ভাতের
ফেনা ও তার সঙ্গে ভুসি মিশিয়ে বাছুরের মুখের
সামনে ধরে।বাছুরটির খাওয়ার খুব কষ্ট হয়। কিন্তু
ধীরে ধীরে খেতে শিখে যায়। এভাবেই কোনমতে বাছুরটি বেঁচে যায়। ছত্তীশের মনের গভীর
আশঙ্কা দূর হয়।মুক্তি পায় তার নিত্যদিনের গভীর চিন্তা থেকে। এদিকে মাতৃহারা বাছুরটির
উপর তার স্নেহ ও ভালবাসা গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে তার অবলম্বন বলতে এ
বিশ্ব সংসারে ঐ বাছুরটি।তাই সে বাছুরটিকে
অতিশয় যত্ন সহকারে বড় করে তোলার চেষ্টা করে। প্রতিদিন পুকুরের জলে স্নান করায়।ওর
জন্য মাঠ থেকে কচি কচি ঘাস কেটে বোঝা
বেঁধে নিয়ে আসে। বাছুরটির পেছনে সময়
দিতে দিতে কখন যে তার দিন পার হয়ে যায়
সে বুঝতেও পারে না। রাতের বেলা কোন
রকমে নিজের জন্য চার পাঁচটি চাপাটি ও
সারাবছর খাওয়ার জন্য বানানো আমের আচার
ও কাটা পেঁয়াজ সহযোগে রাতের খাবার খেয়ে
আটটার মধ্যে শুয়ে পড়ে। শোওয়ার আগেও
একবার বাছুরটিকে দেখে আসে।এ ভাবেই
তার দিন কাটে এবং বাছুরটিও মোটামুটি
বড় হয়ে যায়।অবসর সময়ে যখনই বাছুরটির
সারা শরীরে হাত বোলায়।সে তার আদর
বুঝতে পারে এবং মাঝে মাঝে ছত্তীশের গায়ে
মুখে জিভ দিয়ে চাটতে থাকে। কখন যে
দুজনার মধ্যে গভীর স্নেহ ও ভালবাসার সম্পর্ক
গড়ে ওঠে বোঝাও যায় না। ছত্তীশের বয়স যখন সত্তর বছর পার হয়ে যায় তখন অনিয়মিত
খাদ্যাভ্যাসে অসময়ে বার্ধক্যের দোর গোড়ায়
পৌঁছে যায়।সে বুঝতে পারে আমার কাছে থাকলে বাছুরটি সময় মতো খেতে পাবে না।কে
তার দেখাশোনা করবে?তাই সে মনস্থির করে যে
অল্প মূল্যের বিনিময়ে ওকে পাশের গ্ৰামের এক
গোয়ালাকে বিক্রি করে দেবে কারণ তার ভগ্ন
স্বাস্থ্যের কারণে কবে যে তার মৃত্যু হবে তার ,সে
নিজেও জানে না।তাই তার ভালো চিন্তা করে
পাশের গ্ৰামের রামযতন গোয়ালার নিকট খুব
অল্প মূল্যের বিনিময়ে বেচে দেয় এবং ফিরে
আসার সময় বার বার অনুরোধ করে আসে
সে যেন বাছুরটিকে ভালভাবে রাখে। বাছুরটি
কিছুতেই অন্য গ্ৰামে যেতে চায় না।ও বুঝতে
পারে ওকে অন্য কোথাও রাখা হবে।যতবার
পৌঁছে দিয়ে আসে ততবারই কোন না কোন
ভাবে ছুটে চলে আসে ছত্তীশের কাছে। এভাবেই
কিছুদিন কেটে যায়। অতঃপর একদিন মাঝরাতে ছত্তীশের প্রচন্ড মাথা ব্যথা ও বমি শুরু হয় সঙ্গে জ্বর।
সবাই জানালো ওর ডেঙ্গুজ্বর হয়েছে। বাছুরটি
পরদিন ভোরেই ছত্তীশের ঘরে ঢুকে যায় যেখানে সে শুয়ে ছিল। তার বিছানার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে।অবলা বেজুবান প্রাণী কিছু বলতে না পারলেও বুঝতে পারে তার মালিকের
কিছু হয়েছে। শুধু হাম্বা হাম্বা করতে থাকে এবং
তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে আসে।সে প্রচন্ড
ছটফট করতে থাকে।ইত্যবসরে তার নতুন
মালিক এসে তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। সারা
রাস্তা সে হাম্বা হাম্বা রবে কাঁদতে কাঁদতে রামযতনের বাড়ি পৌঁছায়। রামযতন তাকে
বিচালী কেটে দেয় কিন্তু সে কিছুতেই খায় না।
এভাবে রাতভর মাঝে মাঝেই হাম্বা হাম্বা রবে
তার গভীর কষ্টের কথা জানান দেয়। একটি
অবলা প্রাণীর প্রেম যে মানুষের আপন সন্তানের
থেকে কখনও কখনও অনেক বেশি হতে পারে তা বেশ বোঝা যায়।
পরদিন সকালে সে ছাড়া পাবার সঙ্গে সঙ্গে
সিধা ছত্তীশের বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়।এসে
দেখে যে ছত্তীশের কোন নড়ন চড়ন নাই।
সে বুঝতে পারে তার মালিকের ভীষণ কিছু একটা হয়েছে। আশেপাশের প্রতিটি ঘরে হাম্বা হাম্বা রবে যায় আবার ছত্তীশের খাটের সামনে এসে দাঁড়ায়।ওর অস্থিরতা দেখে পাড়া প্রতিবেশীরা সবাই বুঝতে পারে হয়তো ছত্তীশের 
কোন বড়রকম কিছু বিপদ হয়েছে যার জন্য
তার বাছুরের চোখে এতো ধারা বইছে এবং সে
উন্মাদের মতো হাম্বা হাম্বা রবে ডাক ছাড়ছে।
ওরা সকলে এসে দেখে ছত্তীশের হাত পা সব
বরফের মতো ঠান্ডা ও কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেছে। ওরা অনুমান করে যে সে হয়তো মাঝ
রাত্রে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।ওর তিন
কূলে কেউ না থাকায় গ্ৰামবাসীরা নিজেদের
মধ্যে আলাপ আলোচনা ক'রে তার দাহ সৎকারের জন্য তৈরী হতে থাকে তখন বাছুরটি
ছত্তীশের খাটের সামনে দাঁড়িয়ে স্থির দৃষ্টিতে
ছত্তীশের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কখনও
বা হাম্বা হাম্বা রবে ডেকে ওকে ওঠানোর চেষ্টা
করে। মুখের কাছে মুখ নিয়ে যেয়ে জিভ দিয়ে
মুখে জিভ ঠেকিয়ে উঠাতে চায়।যেন বলতে চায়
" তোমার কী হয়েছে, তুমি এখনও শুয়ে আছো
কেন? এবার তো ওঠো।"কিন্তু কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে ওর মালিকের খাটের পাশে বসে পড়ে।
দুটি বাঁশ দিয়ে যখন মড়াটিকে বেঁধে শশ্মানে
নিয়ে যাওয়া হয় তখন সে  সমগ্ৰ গ্ৰামবাসীর
পেছন পেছন শশ্মানে এসে উপস্থিত হয়। একটা
গভীর অস্থিরতা তার মধ্যে ক্রিয়াশীল সেটা
গ্ৰামবাসীরা বেশ উপলব্ধি করে। ছত্তীশের মুখের 
ঢাকা দেওয়া কাপড় বার বার উঠিয়ে ফেলে দিতে চায়।যেন বলতে চায় "তুমি আমাকে ফেলে
কোথায় যেতে চাও? অনেক হয়েছে এবার তো
ওঠো।"আবার পরক্ষণেই খাটের পাশটিতে বসে
বার বার হাম্বা হাম্বা রবে ডাক ছাড়তে থাকে। এবং যতক্ষণ না শব দেহটিকে অগ্নিকুন্ডের
মধ্যে শোয়ানো হয় ততক্ষণ সে ঠায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।মূক প্রাণী মানুষের
মতো ডাক ছেড়ে কাঁদতে পারে না কিন্তু এ
যেন এক গভীর শোকের ছায়া তাকে দেখেই বোঝা যায়।তার হাম্বা রবে এবং চোখের
সকরুণ দৃষ্টি শশ্মান যাত্রীদের মধ্যেও গভীর
কষ্টের আবহ তৈরি করে দেয়। ছত্তীশের মৃতদেহ
সম্পূর্ণরূপে দাহ না হওয়া পর্যন্ত সে একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। তার নীরব চোখের জল
সমস্ত শশ্মান যাত্রীদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়
সকলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।সমস্ত পরিবেশ
কান্নায় হাহাকার করে ওঠে।গ্ৰামের শশ্মান
ফল্গু নদীর তীরে হওয়ায় ফল্গু নদীও এই
দৃশ্যের সাক্ষী থেকে যায়। 

কবিতা--

কুস্তি খেলার বন্ধু--

এখন অনেক রাত
বসে আছি প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে
আমার পাশে এসে বসলেন
এক দীর্ঘকায় সুপুরুষ ।
লম্বা কোঁকড়ানো চুল ,সুন্দর
একমুখ কালো কালো দাড়ি ।

আমি বিস্ময়ে হতবাক
আমার পাশে এসে বসেছেন
ইনি তো স্বয়ং" রবীন্দ্রনাথ "!
তিনি বললেন " বৎস! তুমি এসো
আমার সঙ্গে তোমার শেষ ট্রেন
আসার এখনও অনেকটাই দেরি আছে।
এসব জায়গায় তুমি আসোনি তো আগে
চলো তোমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি
প্ল্যাটফর্মের বাইরে কোথায় কী দেখার মতো আছে।"
তিনি তাঁর শক্ত মুঠোয় ধরলেন আমার হাত।
বললেন, " এ জায়গার কথা কী তোমার স্মরণে
আসে? আমি আর তুমি রোজ বিকেলে এসে
কতদিন কুস্তির মহড়া দিয়েছি; তুমি প্যাংলা হলে
কী হবে তোমার শরীরেও ছিল ভালোই তাগদ।
যদিও আমারই জিৎ হতো বরাবর"।
আমি বললাম, "তুমি কবে কুস্তির মহড়াতে ভাগ
নিয়েছো ! তবে তুমি এতো এতো গান ও কবিতা
লিখলে কেমনে?"আমার প্রশ্ন শুনে তিনি মৃদু হাসি হাসলেন।  "সেসব গুঢ় রহস্যের কথা নাই বা শুনলে। তবে একথা জেনে রাখো, যতদিন
বেঁচে আছি তোমাকে আমার মনে থাকবে কুস্তি
খেলার পার্টনার হিসেবে।"
আমার শেষ ট্রেন আসতে দেখে তিনি জানালেন,
"এসো! তোমাকে ট্রেনে চড়িয়ে দিই। আমার
কথা তুমি অবশ্যই মনে রেখো, কবি হিসেবে নয়
শুধু কুস্তি খেলার বন্ধু হিসেবে।"
তিনি বললেন, "বিদায় বন্ধু বিদায়! এবার
তোমার সঙ্গে দেখা হবে সরাসরি কুস্তির আখড়ায়।"

Sunday, 9 October 2022

সম্পাদকীয়--


সম্পাদকীয়--


প্রকৃতির মাঝে আমরা সব কিছু খুঁজে পেতে পারি--আনন্দ সুখ দুঃখের বীজ তো তার মাঝেই লুকিয়ে থাকে।

সুখ দুঃখ হাসি কান্না এ সব কিছু জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আর আমাদের মনের মাঝেই তো এ সবের নিবাস।

প্রচন্ড দাবদাহের মাঝ থেকে যখন শীতল হাওয়ার এক ঝোঁকা গায়ে এসে লাগে আমরা যেন সুখের ছোঁয়া পেয়ে যাই। তেমনি অনেক সময় স্মৃতির পাতা থেকে আমরা দুঃখকে টেনে আনি। বস্তুত মন খালিস্থান ধরে রাখতে পারে না। সে স্থানও তার ভরাট চাই। নিদ্রার মাঝে তাই বুঝি স্বপ্ন ঢুকে যায়, সে স্বপ্ন আমাদের মনের সুখ কিংবা বেকার ছাড়া আর কিছু নয়।

পূজোর রেস এখনো চলছে, সামনে আসছে দীপাবলী উৎসব। সব উৎসবের মাঝে আমাদের ভেতরের উৎসব, মানে, মনের উৎসবটাই সবচেয়ে বড় উৎসব। আর একে মনের মাঝে উজ্জীবিত করে রাখার চেষ্টাই বড় কথা।

আসুন আমরা আপাতত কিছু করি, প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখি কিংবা বাতায়নে বসে কিছু পড়ি। মানুষের মন মানসিকতা নিজের মনের মাঝে জড়িয়ে নিয়ে অন্যের সুখ দুঃখের সহভাগী হই। আকাশের মত উদার হলে আমাদের জীবন চলে না, তাই সাঁঝের মাঝে চাঁদ আবির মাখে। না তাকে কখনো রক্তরাগ ভাববো না। আসুন আজ আমরা স্ব-বর্ণ উৎসব সংখ্যার পাতা উল্টাই--দু-একটি কবিতা গল্প পড়ি--উৎসবকে মাথায় রেখে জীবনের কিছুটা সময় না হয় পার করি। ধন্যবাদ--তাপসকিরণ রায়।

সম্পাদকীয় --

উৎসব পরবর্তী দিনগুলি এমনিতেই বড়ো বেশি বিষণ্ন করে তোলে।তাছাড়া যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেল তার জন্য সমস্ত মানুষের মনে  বিসর্জনের ঢাক।এত ছন্দপতন তবুও  থেমে থাকে না কোন কিছুই।পৃথিবী চলে তার নিজস্ব ছন্দে।যারা চলে গেল তাদের পরিজনদের প্রতি সহানুভূতি, সান্ত্বনা রইলো। শান্তি কামনা করি তাদের জন্য,অকালেই প্রাণ গেল যাদের এই দুর্ঘটনায়। দেবদূতের ভূমিকায় এসে যে কয়েকজন যুবক নিজেদের বিপন্ন করে অন্যের প্রাণ বাঁচিয়ে তোলার তাগিদ অনুভব করেছিল তা নামী দামী স্কুলে পড়ার ফসল নয়, তারা কেউই তথাকথিত সভ্যতার মুখোশ নয়।মানবিকতার উজ্জ্বল মুখ। আজকের আত্মসর্বস্ব মানুষের মাঝে  বিরল দৃষ্টান্ত রাখতে সমর্থ হলো প্রকৃত  মানুষ হিসাবে।
 আমরা অভিভাবক গণ আমাদের সন্তানদের প্রকৃত শিক্ষা দিচ্ছি না।এখন শেখাচ্ছি কিভাবে প্রতিযোগিতায় পাল্লাদিতে হয়,নামিদামি ইস্কুলে পড়াতে যাচ্ছি  তা সে ক্ষমতার বাইরে গিয়েও। সন্তানরাও আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।কেরিয়ার সর্বস্ব হয়ে অবহেলা করছে পরিবারকে সমাজকে,যে সমাজ তাকে জুগিয়েছে বাঁচার রসদ।সেই সমাজের মানুষরা আজ তার কেউ নয় যে পরিবেশে সে শ্বাস নিতে শিখেছে সেই পরিবেশের প্রতি তার দায়বদ্ধতা কে অস্বীকার করে চাইছে এগিয়ে যেতে। আমরা ভুলে যাচ্ছি সন্তানরা আগে একজন মানুষ ,সামাজিক মানুষ।তাই সে যাই হোক না কেন,প্রথম শর্ত হোক সন্তানকে একক শিশু নয়,পরিপূর্ণ সামাজিক মানুষ  করে গড়ে তোলা।আর দৃষ্টান্ত স্বরূপ উঠে আসুক সেই সব মানুষদের কথা যাদের শ্রমের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে সভ্যতার ইমারত। দিতে শিখুক শ্রমের প্রতি মর্যাদা। আদর্শ হোক সেই সব মানুষেরা ,মূল্যবোধ কথাটা যারা বাপের জন্মেও শোনেনি অথচ তারা ঠিক জানে  মানুষের প্রাণ বিপন্ন হলে কিভাবে বুক বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়,জানে অন্যের বিপদে আপদে কিভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বন্ধু হয়ে উঠতে হয়। 
এবারের ই পত্রিকাটি না হয়  সেই সব মানুষের আদর্শের কথা ভেবে তাদের প্রতি উৎসর্গ করা হোল।
 সম্পাদক মণ্ডলী সহ পত্রিকার সকল কবি ও লেখক,এবং পাঠককুল কে  জানাই ৺ বিজয়ার আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

গল্প -- নষ্ট বসন্ত -- তাপসকিরণ রায়

নষ্ট বসন্ত 

তাপসকিরণ রায় 


সখী ভাবনা কাহারে বলে...সখী যাতনা কাহারে বলে...তোমরা যে বল দিবস-রজনী ‘ভালবাসা’,‘ভালবাসা’...কখনো কি মনে হয় ভালবাসা এক ধরনের মনের রোগ ?

বরেন আর দশটা ছেলের মত সাধারণ একটি ছেলে। যৌবনে পা ছুঁয়েছে সে। রঙ্গিন তার চোখ। সুন্দরের মাঝে আলাদা ভাবে কিছু খুঁজে নেবার নেই--কালোর মাঝে সুন্দর খুঁজে নিতে হয়। বয়সের রং পারে তাকে দেখে নিতে ! 

বরেনের এমনি একটা মেয়েকে ভালো লাগত। দেখতে খুব কালো, কিন্তু তার মুখশ্রী বড় সুন্দর ! চোখ দুটি নাকি তাকে সবচে বেশী আকর্ষণ করে। ওই স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান ভুলেছে বরেন। মেয়েটি তার মার সঙ্গে মাঝে মাঝে আসে। ওরা বর্তন বিক্রি করে। অনেক সময় পুরনো কাপড় চোপড় বদলে বাসন দিয়ে যায়। মাসে একবার ওদের আনাগোনা থাকেই। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ডাক দিয়ে ওঠে, বর্তন লিবে, বর্তন ? পুরানা কাপড়া দিবে আর বর্তন লিবে !

ওরা অবাঙ্গালী, টুটাফুটা বাংলা বলতে পারে। আসলে ওরা রাজস্থানি--কোথাও অস্থায়ী ডেরা পেতে কয়েক মাস থাকে, কিছু রোজগারপাতি করে চলে যায়। ওই বর্তনবালীর মেয়েটার সঙ্গে দু বছর আগে দেখা বরেনের। কত বয়স হবে--বারো কি তের। ছিমছাম চেহারা--কালোর মাঝে বেশ তূলি আঁকা  শরীর যেন। ক্ষুরধার চেহারা যাকে বলে। জ্বলজ্বল উজ্জ্বল দুটি চোখ, অন্তত বরেনের মনে হয়েছে, পৃথিবীর সমস্ত মায়া যেন ওই চোখ ধরে আছে !

--কি নাম তোমার ? একদিন আড়ালে মেয়েটিকে পেয়ে বরেন জিজ্ঞেস করেছিল। 

হেসে ছিল মেয়েটি--মায়াময় হাসি। একটু সময় নিয়ে উত্তর দিয়েছিল, ঝিনুক--

বাহ, ঝিনুক, এত সুন্দর নাম হয় কারো ! বরেন যেন টালমাটাল। 

অপেক্ষার পর যখনই দেখা হয় এমনি ধরনের একটা দুটো কথা হয়। ঝিনুক ধীরে ধীরে বেশ বড় হয়ে গেছে। ওর মধ্যে লজ্জা লজ্জা ভাব জমে গেছে পুরোদমে। বরেন আলতো পায়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। ঝিনুক জানে বরেন ওর জন্যেই বেরিয়ে এসেছে। দুজনের মুখেই হাসির ছোঁয়া লেগে যায়। কি কথা বলবে বরেন যেন খুঁজেই পায় না !

বরেনের সাথে প্রায় প্রতিমাসে দেখা হয় ঝিনুকের। এমনি প্রায় দুটো বছর কেটে গেছে--ওরা দস্তুর মত প্রেমিক-প্রেমিকা বনে গেছে। বরেন জানে, কোথায় থাকে ঝিনুক। শহরের শেষ প্রান্তে ওদের ডেরা। ছেঁড়া জোড়াতালি দেওয়া তাঁবুর নিচে ওদের বাস। প্রায় দিন ঝিনুক চলে আসে সেই নিরালায়--যেখানে বরেন তাকে আসতে বলে। সেই ছোট নদীটির পারে--যেখানে ঝোপ, ঝাড়,  জঙ্গলের আড়াল রয়েছে। 

--ভালোবাসি ঝিনুক তোকে--

--হামি ভী ভালোবাসি টুকে--প্যায়ার করি--কিন্তুক তুই তো হামারে বিয়া করবি না, জানি--

কেন ?

--হামার মা বাতিয়েছে--তুদের সাথ মোদের বিয়া হবার লয়--

--কেন রে ! প্রেমের বিপাকে পড়ে বরেন অন্ধ--তার সত্তা হারিয়েছে। বয়সের সমস্ত রং ফেলে তার চোখে জমে আছে কালো, অন্ধত্বের রং ! 

আমি তোকে বিয়ে করবো--আমি তোকে ছাড়া বাঁচব না রে ঝিনুক ! ঝিনুকের হাত বরেনের হাতে, ঝিনুকের মুখ বরেনের মুখের একেবারে ছুঁইছুঁই পাশটিতে, উভয়ের বাষ্পায়িত শ্বাস উভয়ের মুখমন্ডলে স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছে--ওরা চুপচাপ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে--নিষ্পলক। 

ঝিনুকের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসছে, মা বইলেছে,তুদের সঙ্গে হামাদের বিয়া হোয় না রে--

হয়, হয়, হয়, বরেন প্রেমাবেশে জড়িয়ে ধরে ঝিনুককে। 

ঝিনুকের মা একদিন বাধা দেয় বরেনকে, সাবধান করে দেয়, আমার লেড়কীর দিকে তু হাত বাড়াবি না বাতিয়ে দিলাম !

বরেন কিছুতেই শুনতে চায় না--ঝিনুকের মা বলে, হামাদের অন্দর ভালবাসা বইলে কিছু নাই--তুর যুদি ঝিনুকের সঙ্গে এত প্যায়ার তবে তুকে হামি বাতাই দিই, হাজার টাকা হাতে লিয়ে তবে হামাদের ডেরায় আসবি--

সেদিন বরেন বাবার রাখা মায়নার টাকা থেকে এক হাজার টাকা সরিয়ে নিলো। আর ভর দুপুরে গিয়ে হাজির হল ঝিনুকদের ডেরায়। ঝিনুক আর তার মা ঘরে ছিল। বরেনকে দেখেই ঝিনুকের মা বলে উঠলো, কি খবর ? 

চাপা স্বরে বরেন বলে ওঠে, টাকা এনেছি। 

এনেছিস ? দে দেখি—

বরেন হাজার টাকা ঝিনুকের মার হাতে তুলে দেয়। 

ঝিনুকের মা ঝিনুকের দিকে তাকায়, ঝিনুক চাপা স্বরে কেঁদে উঠে, না লা লা...

--ঝিনুকের মা ঝিনুকের দিকে লাল চোখ নিয়ে বলে উঠলো, যা বাতিয়েছি তাই করবি--মনে থাকে যেন—তারপর বরেনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, তুদের একলা ডেরাতে ছেইড়ে দিলাম...হামি এক ঘণ্টা বাদে আসব...তরা যত পারিস প্যায়ার-ভালবাসা কইরে নে--

ঝিনুক কাঁদছে--হামাদের কুনো প্যায়ার নাই--নেও তুমি হাজার টাকা দিইয়েছ--হামার শরীল তুমাকে দিলাম--তুমি আমারে আদর করো...জড়াইয়া ধরো...আমারে ভালোবাসো...

বরেনের মুখ থেকে কোন কথা সরল না--সে ঝিনুকের মুখোমুখি হয়ে নিশ্চল ভাবে দাঁড়িয়ে থাকল। 

                              সমাপ্ত

গল্প -- বাঘিনীর সঙ্গে প্রেম --শংকর ব্রহ্ম

গল্প --  

বাঘিনীর সঙ্গে প্রেম --

শংকর ব্রহ্ম

-----------------------------------

আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি যে এটা একটা বাঘিনী ছিল। আমি তার গড়গড় আওয়াজ শুনেছিলাম শুধু।

আমার বাড়ির ভেতরের প্রবেশের পথটি খোলা ছিল, আমি দেখলাম সে সেখান দিয়ে ঢুকেছিল। ঢুকেই সে এদিকে সেদিকে দু'একবার তাকাল। ভাবলো একটু কিছু । তারপর

আমার ঘরে ভিতর অন্ধকারে সে এসেছিল, এসে আমার পাশে এসে শুয়ে পড়ল, আধো আলোতে দেখে আমি পরে চিনলাম এটা একটা বাঘিনী।

         শুয়ে পড়ে সে গভীর এবং স্বাভাবিক শ্বাস নিচ্ছিলো এবং শীঘ্রই ঘুমিয়ে পড়ল, মনে হলো। তার গা থেকে লতা পাতার  ভেজা তাজা গন্ধ আসছিল। একটি বন্য প্রাণীর গন্ধ যা আমাকে ভীষণ সম্মোহিত করে দিয়েছে। আমি এটা বলতে পারি যে সে রাতে একটি বাঘিনী আমার বাড়িতে এসে আমার পাশে শুয়ে পড়ল। প্রথমে তার গা ভেজা ছিল, তার ত্বক থেকে আর্দ্রতা ছড়িয়ে পড়েছিল, যা আমার চারপাশে এক শীতলতার সৃষ্টি করেছিল। 

আমার কাছে আসার জন্য অবশ্যই তার সাঁতার কাটার প্রয়োজন হয়ে পড়ে ছিল, কারণ কাছেই ছিল বড় একটা নদী, আর তার ওপারে বন।

শরৎকালের মতো শীতল বাতাস সমভূমি অতিক্রম করছিল এখানে আসছিল। গ্রীষ্মকাল এখনও বর্তমান এবং গরমের ভাবটাও তাজা আছে। বাতাস আসছিল দূরের নদীটা থেকে, এবং আমি তার জলজ গন্ধ নাকে টের পাচ্ছিলাম ভালভাবে। 

        রাতে আমিও ভাল ঘুমিয়েছি। বাঘিনীও ছিল চুপচাপ এবং মনেহয় ভাল ঘুম হয়েছে তার। 

        সকালের দিকে, উষ্ণতা ফিরে এসেছিল তাঁর শরীরে। যখন সকালে তার ঘুম ভাঙল, তখন সে ঘর থেকে বেরিয়ে, আমার বাড়ির সামনে বাগানে গিয়ে দাঁড়িয়ে 

বড় নদীটার দিকে তাকিয়ে ছিল।

আমি তাকে কাছে আসবার জন্য ইশারা করলাম 

এবং আমি তাকে মাংস খেতে দিলাম।

আমি আশা করেছিলাম যে সে হয়তো কাছে এসে আমার সাথে কিছু কথা বলবে, কিন্ত সে ছিল নীরব। তবে সময়ে সময়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল ,তার চোখ দেখে মনে হচ্ছিল আমাকে তার কিছুই বলার নেই। অবশেষে. আমি তার সাথে কথা বলার প্রত্যাশা ছেড়ে দিলাম। অন্য কাজে ব্যস্থ হয়ে পড়লাম। সে সেখানেই বসেছিল।

তবে প্রায়ই আমি তার সাথে আমার ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করতাম এবং আমি ভাবতাম যে সে সেগুলো বুঝতে পারছে।

যে রাতে, বাঘিনীটি আবার আমার পাশে ঘুমিয়েছিল। তারপরের দিন সে বাড়ির পাশে আমার আম বাগানে দিন কাটিয়েছি সূর্যের বিপরীতে, ছায়ায় বসে। মাঝে মাঝে আমি ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেতাম, দূরের বনের আর নদীর দিকে তাকিয়ে। আমি তাকে দেখতাম নদীর ধারে দাঁড়িয়ে সে প্রবাহিত জলের দিকে তাকিয়ে থাকতো।

সেদিন আমি তাকে বলতে গেছিলাম, 

'বেশ কিছুদিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে বাইরে যাব, তোমাকে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমার না থাকর সময়, তা বেশ কয়েক দিন ধরে চলতে পারে, তুমি বাড়ির ভিতরে বা বাইরে থাকতে চাও?

আমি দরজাটি তালাবন্ধ করব কিনা জানতে চাই। উত্তর না দিয়ে বাঘিনীটি শুয়ে পড়ল দ্বারপ্রান্তে, এবং আমি জানতাম যে আমার ঘর বন্ধ করার দরকার নেই, আমি চলে গিয়েছিলাম।

  আমি ফিরে এসে দেখি, বাঘটি খোলা চোখে শুয়ে আছে। আমাকে দেখে সে উঠে বসল। কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর উদাস ভাবে দূরে তাকলো।

   বাড়িটি যেমন ছিল তেমনি আছে। আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই এবং তার জন্য আমি কিছু মাংস নিয়ে এসেছি, তাকে জানাই। সে তার কোন প্রতি-উত্তর না দিয়ে আবার দরজার পাশেই শুয়ে পড়ে।

তার কিছুদিন পর আমি যখন নদীতে মাছ ধরতে যাই তখন সে প্রায়ই আমার সঙ্গে যেত। নদীর পাশে বসে থাকত। আমি যে মাছটি ধরতাম, তা মনোযোগ দিয়ে দেখতো। 

       যখন আমি বনের মধ্যে কাঠ কাটতে যেতাম (সেখানে সে ছিল) সে আমার সঙ্গে যেত এবং ফিরে এসে প্রতি রাতে সে আমার পাশে ঘুমাত। 

          তারপর একদিন সে ভোরের দিকে আমার বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেল ধীরে ধীরে এবং নিঃশব্দে।

         যাবার আগে সে আমাকে একবার স্পর্শ করল আমাকে জাগাতে, এবং সে তাকিয়ে রইল আমার মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে. আমি বুঝিনি যে সে চলে যাবে , তারপর সে ধীরে ধীরে আমার বাড়ির দরজা দিয়ে বেরিয়ে,  নদীর দিকে বৃষ্টিতে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল দেখে, 

আমি সে দিকে তাকিয়ে রইলাম। সাঁতার কেটে নদীর ওপারে সে চলে গেল। তখন টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল।

আমি আর বিছানা ছেড়ে উঠিনি। পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, একটু পরেই সে ফিরে আসবে। কিন্তু আশ্চর্য, সে আর ফিরে এলো না।

           আমি ভাবতে পারিনি যে চিরদিনের জন্য আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। জানতে পারলে , বুঝতে পারলে, হয়তো তাকে যেতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতাম।

আমি এখনও আশা করি যে সে আবার একদিন আমার কাছে ফিরে আসবে।

          আমি আজকাল আর নদীতে মাছ ধরতে যাই না। কিংবা যাই না বনে কাঠ কাটতে। আমার যেন এখন আর কোন কাজ নেই। কোন কাজ করতে আমার আর ভালও লাগে না।

         আমি এখন নদীর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকি, তার কথা ভাবি। যেদিন সে প্রথম এসেছিল, মনে পড়ে যায় সে কথা।  আনন্দ যেন সে আমার কাছ থেকে কেড়ে  নিয়ে চলে গেছে।

আজকাল আমি ঘুমোতে যাওয়ার আগে, একবার হলেও ভাবি তার কথা, একদিন হয়তো সে ফিরে এসে আমার পাশে শুয়ে পড়বে। ঘুমের মধ্যে , আমি তার গাঢ় শ্বাস ফেলার শব্দে জেগে উঠে দেখব সে আমার পাশে শুয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। আমি আজকাল একা একাই শুয়ে থাকি । আর ঘুম আসে না রাতে , তার কথা ভাবতে ভাবতে ভোর হয়ে যায়। আমি বাইরে বেরিয়ে এসে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি। একটা কিছু সাতার কেটে আমার দিকে আসছে যেন দেখতে পাই। তারপর সন্ধ্যা নেমে এলে চরাচর জুড়ে, আমি হতাশ হয়ে বড়ি ফিরে আসি।

গল্প--মনের কোণে ধুলো --কবিরুল (রঞ্জিত মল্লিক )



গল্প--

মনের কোণে ধুলো --
কবিরুল (রঞ্জিত মল্লিক )

         ডিউটি শেষ করে মেজর জেনারেল যোগিন্দর সিং যখন আর্মির বেস ক্যাম্পে এসে পৌঁছল তখনই সিনিয়র অফিসার তাকে ফোনটা করেন। একটা টুরিস্ট বাসকে  জঙ্গীরা আটক করে রেখেছে। সেই বাসে ষাট জন যাত্রী জঙ্গীদের কবলে পড়ে নিদারুণ বিপদের সন্মুখীন। তাদের মধ্যে এক বিবাহিত মহিলা জঙ্গীদের চোখে ধুলো দিয়ে বাস থেকে নেমে পালিয়ে যায়। কিন্তু কিছুদূর যাবার পর মেয়েটা পথ হারিয়ে যায়।

            জঙ্গীদের কবল থেকে ঐ টুরিস্ট বাসটিকে উদ্ধারের দায়িত্ব যোগিন্দর সিং কে দেওয়া হয়। সেই সাথে ঐ মেয়েটিকেও উদ্ধার করতে হবে। যোগিন্দরকে একটু টেন্সড্ দেখাল। এক কাপ কফি খেয়েই ও নিজের গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সিনিয়র অফিসারের সাথে দেখা করতে।

           সিনিয়র অফিসারের সাথে আলোচনা করে নিজের দায়িত্বটা বুঝে নিল। তারপর বেরিয়ে পড়ল অপারেশনের উদ্দেশ্যে। আজ যোগির কাছে এটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। জঙ্গীদের কবল থেকে বিপন্ন যাত্রীদের ওকে উদ্ধার করতেই হবে।

            নিজের মোবাইলে জিপিএস টা অন করেই অপারেশনের একটা সুন্দর ছক কষে ফেলল। তারপর অনেক সার্চ করার পর লোকেশন ট্রেস করে জঙ্গী সমেত জঙ্গী কবলিত বাসটা খুঁজে বার করল। নিজের জীবন বিপন্ন করে জঙ্গীদের সাথে দারুণ লড়াই করে যাত্রীদের উদ্ধার করল। দু একজন জঙ্গী মারাও গেল। তবে পালিয়ে যাওয়া সেই মহিলার এখনও কোন খোঁজ পাইনি। ওকেই এখন খুঁজে বার করতে হবে।

            যোগি একটা জিনিস বুঝতে পেরেছে মেয়েটা কাছাকাছি কোথাও না কোথাও আছে। বেশ কিছুটা পথ যাবার পর জঙ্গলের পাশ দিয়ে একটা রেল লাইন চলে গেছে। রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা মহিলাদের  ছোট পার্স পাওয়া গেল। তাতেই যোগি সিউর হল যে মহিলা এই দিক দিয়ে গেছে। মহিলার পার্সটা খুলতেই কেমন চমকে উঠল। ভিতরে একটা ছবি। ছবিটা তার খুব চেনা। তার বহুদিনের পরিচিত মানালীর ছবি। মানালীর সাথে অনেক দিন হল কোন দেখা নেই। জানেনা ও কেমন আছে। তবে এভাবে মানালীর স্মৃতি ফিরে আসবে ও ভাবতেই পারেনি। চোখটা ছলছল করে উঠল।

             যোগিন্দরের সাথে মানালির এক বিয়ে বাড়িতে আলাপ। তারপর আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বারে। পরে সেই ঘনিষ্ঠতা প্রেম অবধি পৌঁছায়। যোগিন্দর বারো ক্লাস পাশ করার পর আর্মির চাকরির জন্য পরীক্ষা দেয়। যোগির পরিবার ভীষণ অভাবী। ওর একটা চাকরি হলে পরিবারটা বেঁচে যায়। যোগি একটা যব পাবার জন্য তাই ভীষণ চেষ্টা করছে।

            মানালির পরিবার বেশ উচ্চবিত্ত। ওর আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন। ও চাই যোগি অনেক অনেক বড় পদে চাকরি করূক। বড়লোকের মেয়ে বলে মানার একটু ঠাট বাঁট ও আছে। সময়ে অসময়ে ও যোগিকে হেয় করতেও ছাড়েনা।

             একবার মানার জন্মদিনে ওর বাবা একটা বিশাল বড় পার্টি দেয়। বেশ গন্য মান্য আর প্রভাবশালী  ব্যক্তি এই অনুষ্ঠানে আসে। যোগিও আসে। তবে যোগি একটা অতি সাধারণ মানের গিফ্ট দেয়। তাতে মানার মনে খুব লাগে। মানা ভেবেছিল যোগি অন্যদের মত দামী গিফ্ট দেবে। যোগিরও এতে অভিমান হয় একটু। তবু ও মানাকে ভালবাসে। তাই মুখে কিছু বলেনা।

              এরপর আস্তে আস্তে মানা আর যোগির রিলেশন তলানিতে এসে ঠেকে। মানার জীবনে আদিত্য এসে হাজির হয়। ও বিশাল বড়লোকের ছেলে। পরে যোগি আর্মিতে একটা ভাল চাকরি পাই। যোগির আর্মিতে যোগদান মানা মেনে নিতে পারেনা। মানা আস্তে আস্তে যোগিকে ভুলে যায়। কিন্তু যোগি মানাকে  আগের মতই ভালবাসে।

             পরে মানার সাথে আদির ছাড়াছড়ি হলে  মানা অন্য একটা শিল্পপতির সুযোগ্য ছেলেকে বিয়ে করে। স্বার্থপর মানা যোগিকে বিয়েতে ইনভাইট পর্যন্ত করেনি।

             এরপর অনেক বছর কেটে গেছে।

                     .....   ......   .......   .........

           আজ ছবিটা দেখে মানালীর জন্য মনটা ছটফট করে ঊঠল। ও জানে মানালী এখানে কোথাও লুকিয়ে আছে। জঙ্গীদের ভয়ে বেরোতে সাহস পাচ্ছেনা। অন্ধকার আরো সবল হচ্ছে। যোগি রেললাইনের দুই ধারে খূব খোঁজাখুঁজি করল। তারপর বেশ অনেকটা পথ পেরোবার পর একটা পোড়ো মন্দির দেখতে পায়। ওখানেই ও ওর আদরের মানাকে দেখতে পাই। লুকিয়ে ছিল।


            মানা যোগিন্দরকে অন্ধকারে চিনতে পারেনি। তারণর একটু আলোর রেখা দেখতেই যোগিকে চিনতে পারে। মানা নিজের ভুলটা বুঝতে পারে। ও যোগির কাছে ফিরতে চাই। আদির সাথে মানার রিলেশনটা সুখের হয়নি। কারণ মানার বাসনা অসীম। পরে শিল্পপতির ছেলেও মানার অভিসন্ধি বুঝতে পারে। যদিও সে মানাকে বিয়ে করে দু বছর পরে ডিভোর্স দিয়ে চলে যায়।মানালী এখন ভীষণ একা।অনেকদিন পরে যোগিকে সামনে পেয়ে নিজের মনের কথা গুলো বলে নিজেকে হালকা করল।

            গল্প করতে করতে কখন যে সময়টা কেটে গেছে ওরা জানতেই পারেনি। মানার লাগেজটা হাতে ধরে নিজের গাড়ি অবধি এগিয়ে নিয়ে গেল যোগিন্দর। সীট বেল্টটা শক্ত করে বেঁধে নিল।আদরের মানাকে জঙ্গীর কবল থেকে মুক্ত করে পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে চলল নিজের আর্মির কোয়ার্টারে।

             যোগির সাজানো ঘর গুলো দেখে মানার ঈর্ষার পারদ অনেকটাই বেড়ে গেল। ও ভাবতেই পারেনি গ্রামের ছেলে নিন্মবিত্ত যোগিন্দর এতটাই বদলে ফেলবে নিজেকে।  মানালী বুঝতে পেরেছে যে সে হেরে গেছে। রাতের ডিনারেও যোগি মানার আর্থিক মর্যাদার সাথে সঙ্গতি রেখে খাবারে চমক এনেছে। যোগিকে হেয় করা যে তার উচিৎ হয়নি সেটা মানা বুঝতে পেরেছে।

               রাতের ঘুমটা খুব ভালই হয়েছে মানালীর। ঘুম ভাঙ্গতেই দেখে যোগির ঘরের সামনে সোনা রোদের ঝরণা ঝলমল করছে।

            ড্রেসিং টেবিলের কাছে দাড়াতেই চোখে পড়ল একটা কার্ড। কার্ডে জ্বল জ্বল করছে - 

                " Happy Birth Day

                      My dear Manaly "

          মানালি ভুলেই গিয়েছিল যে আজ তার জন্মদিন। শত বিপদ , ঝুঁকি আর কাজের মধ্যে থেকেও যোগিন্দর তার জীবন শুধু বাঁচায় নি তাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে এনে ছিল তার নিজের আলো ঝলমল বাসায়। তার জন্মদিন পালন করে তাকে ধন্য করে ছিল। যোগিন্দর আজ বিশাল বড় আর্মি অফিসার। ওর আজ অনেক নাম ডাক।

              দুপুরের একটু আগেই সাইরার ফোনটা বেজে উঠেছিল। দুমাস পরেই ওর আর সাইরার শাদি। যোগিন্দর নিজের গাড়িতে উঠেই গাড়ি স্টার্ট দিল। একরাশ ধুলো উড়িয়ে গাড়িটা সোজা ছুটে গেল শপিং মলের দিকে।

              পিছনে পড়ে থাকল জমাট ধুলোর মেঘ আর মানালীর নীরব কান্না।

            মানালীর মনের কোণে জমে থাকা দীর্ঘ দিনের  ধুলো একটু একটু করে ঐ জমাট ধুলোর মেঘের কলেবর বৃদ্ধি করল।


ঊশ্রী মন্ডলের কবিতা --

ঊশ্রী মন্ডলের কবিতা --
আমি উলুপী

স্মৃতির কুঠূরিতে সে ঘটনাগুলি হায়..
আজও জ্বল জ্বল করে জ্বলছে মনভূমিতে স্বমহিমায় ,
দেখেছিলাম কুন্তী পুত্র বিশ্ব জয়ি সেই শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধরকে  ;
এসেছিলো সে বনবাসে বিবাহের শর্ত লঙ্ঘনের কারণে ,
আমিও ছিলাম তারি অনুসরণে..|

স্নানরত অর্জুনকে মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম..
নিজের করে পাবার কামনায় বিবাহের প্রস্তাবও দিলাম ,
প্রথমে তিনি রাজি হতে চাচ্ছিলেন না কিছুতেই- কিন্তু..
আমার কথায়,যুক্তিতে অবশেষে রাজি হয়ে যান ;
এসেছিলো আমাদের মিলনের পুত্র ইরাবান..।

বাল্যকাল হতেই মাতৃগৃহে সে পালিত..
তাই নিজ পুত্রের কথা অর্জুন না জানতো ,
তৃতীয় পান্ডব তখন সুরলোকে নিচ্ছিলো অস্ত্র শিক্ষা একাগ্রচিত্তে ;
ইরাবান তাঁর নিকটে গিয়ে দিলো নিজ পরিচয়,
পরস্পর আর রইলো না অজ্ঞাতপরিচয়..|

মোর পুত্র দিয়েছিলো কথা পিতারে..
অবশ্যই আসবে যোদ্ধা বেশে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে প্রয়োজনানুসারে ,
চলল পুত্র পিতার আহ্বানে ভীষণ রণে অতীব বিক্রমে ;
ঝাঁপিয়ে পড়লো করলো নাশ নিদারুনে পান্ডব বিরোধীদের ,
নিলো নব পরিকল্পনা জেতাতে পান্ডবদের..|

কোনও বীরপুরুষ কালাপ্পালি প্রথার যুদ্ধে ..
দেবী কালীর সামনে নিজেকে উৎসর্গ করেন শুদ্ধে ,
বিশ্বাস কর, তবেই হবে সেই পক্ষের জয় অবশ্যম্ভাবী ;
ইরাবান পাণ্ডবপক্ষ থেকে উৎসর্গের  ইচ্ছা প্রকাশ করে ,
নিজেকে বলি দিতে চায় অকাতরে..|

সন্তুষ্ট শ্রীকৃষ্ণ হতে তিনটি বর লভে..
একটি - যুদ্ধে বীরের মৃত্যু বরণ করা জয়লাভে,
দ্বিতীয়টি - আঠেরো দিনের যুদ্ধ পুরোটা দেখার সৌভাগ্য লাভ ;
তৃতীয়টি - দাহ না করা হয় ,মৃত্যুর পর,
এই রূপ ব্যবস্থাই রইলো অতঃপর..|

সে সময়ের রীতি ছিলো অন্যরূপ..
অনূঢ়দের মৃত্যুতে দাহর পরিবর্তে কবরস্থই ছিল সত্যরূপ ,
এই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় পর্যন্ত ইরাবান ছিলো অবিবাহিত  ;
কোনও নারী তাঁকে চাইছিল না বিয়ে করতে ,
অতঃপর শ্রীকৃষ্ণ নিলেন উপায় ব্রতে..|

শ্রীকৃষ্ণ নারীরূপ ধারণে হলেন মোহিনী..
বিয়ের পড়ে মৃত্যুআগে একরাত কাটান হয়ে গৃহিনী , 
আরাবনের মৃত্যুর পর শ্রীকৃষ্ণ বৈধব্য বেশে করে শোকপালন  ;
পরের দিন আবার আসল চেহারায় ফিরে আসেন,
এইভাবেই তিনি সকল শর্তপূরণ করেন..|

আত্মবলির পর বত্রিশ টুকরোর দেহাংশ ..
কালীর কাছে উৎসর্গ করা হয় সকলই খণ্ডাংশ ,
যুদ্ধক্ষেত্রে এক খুঁটির আগায় চড়িয়ে রাখা হয় কাটামুণ্ডু  ;
সেখান থেকেই সমস্ত কিছু তার গোচরে আসে
তাঁর ,
আকাশে বাতাসে ভাসে হাহাকার..|

আমি নাগরাজ কৌরভ্যনাগের কন্যা উলুপী..
আজও সন্তান হারানোর বেদনায় কাঁদি নিজেকে কোপী ,
কিন্তু কুন্তীপুত্র অর্জুন তোমায় অকৃপন ভালোবেসে ছিলাম ;
ধর্মানুযায়ী যুদ্ধ ক্ষেত্রে ইরাবানকে যেতে অনুমতি দিয়েছিলাম,
তাই সম্পূর্ণ একাই রয়ে গেলাম..|

প্রণয় ও অভিমান

          শোন লো শ্রীমতি রাধারাণী..
  শুনে , ওই বংশীধ্বনি-হোস না পাগলিনী ,
          যাসনে রে , সেথায় একাকিনি ;
      ঘরে আছে ননদিনী , সে কটুভাষিণী ,
       পারবি কী সইতে -ওরে মৃদুভাষিণী ?

            এলো যে ঘনিয়ে নিশীথিনী..
বয়ে চলে কল্লোলিনী,সেযে সদা আমোদিনী,
            শোন সরীসৃপের সরসরানী ;
         উলূকের ওই কর্কশ তীক্ষ্নধ্বনি ,
          জংলী হায়নার হিংস্র হাহাধ্বনি  |

              ওরে কানু বাজাসনে বেনু..
    রাধারানী প্রেমে স্থানু,হলো যে মগ্ন মজনু,
             সরসী বিম্বে দেখে তব অতনু ;
           ক্রমাগত কৃশ হচ্ছে এ গৌর সুতনু ,
           মোহ মুক্ত কর বলি করে নতজানু  |

              মিলন আশে নিচ্ছে যতন..
    ফনী করে সম্মোহণ , বেচে হাতের কঙ্কন ,
             ভূমি করে পিছল ইচ্ছামতন ;
          পদতল ঐ কন্টকে করে আঘাতন ,
            নিরব চলার কামনায় সচেতন  |
          
              অভিশারে চললো মোহিনী..
        উৎসর্গের ইচ্ছায়,হ্লাদিনী হলো লাবণী,
              সঙ্কেত কুঞ্জে এলো বৃষনন্দিনী ;
          দেখে কৃষ্ণ নাই হেথা হলো বিষাদিনী ,
           হৃদয় করে কোপে পূর্ণ অভিমানিনী  |

               শক্তির ক্রোধে ফুল শুকায়..
       সমগ্র বৃন্দাবনেই , হাহাকার মেচে যায় ,
               শুনে কানাই বরসনায় ধায়  ;
          ফুল দিয়ে মানিনীর মান যে ভাঙ্গায় ,
            চারো দিশা গায় গীত একলহমায়  |

                 বিনা প্রেমে জীবন বিবর্ণ...
          প্রণয় অভিমান , পরস্পরেই পরিপূর্ণ ,
               বিশ্বাস, সম্মান, দায়িত্বই গণ্য  ;
     ঊশ্রী বলে চাই হতে ঐ শুদ্ধ অমৃতে পূর্ণ,
    শেষ ভালো যার,তার সবই ভালো অনন্য |


আমি প্রণমী 


তখন ছিলো সময়টা ৫৬৩ বি.সি. পৃথিবীর..
শুদ্ধোধন ছিলেন , গোষ্ঠী প্রধান-শাক্য গোষ্ঠীর ,
পত্নী মায়াদেবী ,পদ্মফুল শ্বেতহস্তী-স্বপ্নে দেখলেন..
কোল্লীয় রাজ্যের রাজকুমারী পিতৃগৃহে চললেন ,
পথেস্থিত ,লুম্বিনীবাগানে শালবৃক্ষের তলে জন্মিলেন-তথাগত..
এরপরই ,সাতদিনের মধ্যে-মাতা হলেন গত ;
মহাপ্রজাপতি গৌতমী , পালন করেন-জননীহারা সিদ্ধার্থকে..
শাক্যমুনি , গৌতম নামে -পরিচিত হলেন এথেকে  l

জাতকের মধ্যে , মহাপুরুষের লক্ষণ আছে-বললেন কুলপুরোহিত..
যুবাবস্থায় , বিবাহবন্ধনে যশোধরার সহিত হলেন- নববিবাহিত,
তাহাদেরই , সংসারধর্মে রাহুল- পুত্র রূপে জন্মায়..
সাতদিনের পরেই , গৌতম -গৃহত্যাগ করে যায় ,
জরা , ব্যাধি , মৃত্যু ,অনাসক্ত আনন্দিত সন্ন্যাসী..
দেখে সিদ্ধার্থ , করলেন গৃহত্যাগ- হলেন পথবাসী ;
শান্তির আশে , নিজ হৃদয়- করলেন উন্মোচিত..
এই ঘটনা ,বৌদ্ধধর্মে মহাভিনিষ্ক্রমণ নামেই- পরিচিত |

গৃহত্যাগের সময় , কিছুদূর যায়-ঘোড়া কন্থক..
সঙ্গে ছিলো ,প্রিয় সারথী - বন্ধু ছন্দক ,
সংসার ত্যাগের পর প্রথমেই যান বৈশালী..
সেইখানেই ছিলেন প্রথম গুরু অত্যন্ত জ্ঞানশালী ,
দর্শনের অন্যতম সাধক সাংখ্য আলারা কালাম..
শিক্ষা গ্রহণেও মনখিদে মেটাতে হলেন নাকাম ;
এরপর গুরুরূপে নির্বাচন করলেন রুদ্রক রামপুত্রকে..
পঞ্চভিক্ষুর সাথে ধ্যানে বসলেন উস্কাতে উপলব্ধিকে l

ঘুরতে ঘুরতে গয়ার কাছে উরুবিল্বগ্রামে আসেন..
বোধগয়া নামে পরিচিত -সেখানে ধ্যানে বসেন ,
স্থানীয়মেয়ে , সুজাতার দেওয়া-একবাটি পায়েস খান..
নৈরঞ্জনা নদীর তীরে অশ্বত্থতলে ধ্যানেতে বসেন ,
এরপরেই তিনি বোধিত্ব লাভে হন অববুদ্ধ..
সেই অশ্বত্থ বৃক্ষ বোধিবৃক্ষ নামে প্রসিদ্ধ  ;
বুদ্ধত্ব অর্জনে নাম হয় বুদ্ধ ,তথাগত..
বুদ্ধ শব্দের অর্থ , যে জ্ঞানপূর্ণ শাশ্বত  |

জ্ঞানকে প্রসার এবং মানুষের দুঃখ নিবারণে..
তথাগত করলেন যাত্রা ধর্ম ও জ্ঞানবিতরণে ,
সারনাথের মৃগদাব বাগানে প্রথম করেন ব্যাখ্যাত.. পঞ্চভিক্ষুর নিকটে ,তাহাই - ধর্মচক্রপ্রবর্তন নামে খ্যাত ;
বুদ্ধদেব ,শিষ্যদের জন্য -সংঘ প্রতিষ্ঠা করলেন..
সমবায় ও একতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য সম্মুখে রাখলেন ,
দূর করেন , জাতিভেদজনিত ,সকল সংকীর্ণ মানসিকতাকে...
মুক্তির পথ দেখালেন ধর্মের জটিলতা থেকে ।

কণিষ্ক বৌদ্ধধর্ম ভারতে ও বহিরবিশ্বে ছড়ান..
সম্রাট অশোকও একই পন্থা গুলি আওড়ান ,
তৎকালীন ভারতবর্ষে বুদ্ধদেবের ধর্মমতে হয়েছিল একত্রিত..
সকলশ্রেণীই , সহজ সরল ধর্মজে হয়েছিল সন্মত ,
জীবিতকালে তাহার উপদেশাবলী ধর্মনীতি হয়নি লিখিত..
মুখেমুখে জনগণের সহজবোধ্য ভাষায় হতো ঘোষিত ;
তিনি কখনই করেননি বঞ্চিত জ্ঞান হতে..
প্রানভরে সেইসব দান করে গেছেন অনন্যচিত্তে |

গৌতমবুদ্ধ ৪৮৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে আশি বছর বয়সে..
দেহত্যাগ করেন গোরক্ষপুরের কুশীনগরে শেষ নিঃশ্বাসে ,
মহাপরিনির্বাণের পরে তার বাণী করতে সংকলন.. রাজগৃহে প্রথম বৌদ্ধ সম্মেলনের হয় আহ্বান ,
এস্থানে সপ্তপর্ণী পর্বত গুহায় অনুষ্ঠিত এ'সংগীতি.. মহাত্মার উপদেশাবলী দুখন্ডে সংকলিতরূপে হচ্ছে প্রতীতি ;
বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি,ধম্মং শরণং গচ্ছামি..
সংঘং শরণং গচ্ছামি , এ'বানীরে আমি প্রণমি |

কাব্য -- বীরবাহু বধ --রমা গুপ্ত

কাব্য -- 

বীরবাহু বধ --
রমা গুপ্ত

শোকাগ্ৰস্ত  লঙ্কাপতি    বীরবাহু তরে
বিষাদে নিঃশ্বাস ছাড়ে   বলে ক্ষীণ স্বরে
হে বীর লঙ্কার তুমি        কুলের প্রবর
রাক্ষস কুলেতে জন্ম     প্রতাপ প্রখর।
স্তম্ভিত হয়েছে রাম        মনে খুশি তাই,
তোমার মতন বীর         বুঝি দেখে নাই।
হায় পুত্র বীরবাহু           বাহুবলি কত
হৃদয়েতে বজ্র যেন         হানে ব্যথা শত।

 ওরে  ভগ্নী সূর্পনখা!      তোর অপমানে
ক্রোধান্বিত হয়ে কেন,     গেলাম সে স্থানে!
মতিভ্রম হলো শেষে        ছদ্মবেশ ধরে 
রাম লক্ষ্মী হরণের          পাপ স্পর্শ করে।
অন্তরেতে হাহাকার         নেই পরিসীমা
হৃদি বৃন্তে ফোটা ফুল       স্নেহ মধুরিমা,
কেউ যদি নেয় ছিঁড়ে        রক্ত ক্ষরণেতে
নিস্তেজ হয় যে দেহ          শোক আবহেতে।

যন্ত্রণা অনলে পুড়ে           মরি আমি। যাও
মন্দোদরী, চিত্রাঙ্গদা        কে সান্ত্বনা দাও।
বাক্যহীনা চিত্রাঙ্গদা         বসে পুত্র ধরে
মন্দোদরী গেলে কাছে     বলে সকাতরে,
দিয়েছি সন্তান যবে         লঙ্কেশের কাছে  মনে মনে জানি পুত্র        সুরক্ষিত আছে।
মেনে নিতে পারিনা         যে এই অঘটন,
হৈমপুরী রক্ষা হেতু           বধ মম ধন।

ততক্ষণে সভা মধ্যে         প্রজাদের ভীড়
বীরবাহু বধে সব              বিষণ্ণ গম্ভীর।
লঙ্কাপতি এসেছেন           ধীর পদে অতি,
চিত্রাঙ্গদাকে  বলেন          শান্ত রাখো মতি।
বিভীষণ করেছে যে,         মৈত্রী বৈরী সাথে
লঙ্কা রক্ষা ভার দিই          বীরবাহু হাতে।
মোক্ষম সমরে রক্ষে          প্রাসাদ লঙ্কার 
কুলরত্ন বীরবাহু                রাজ্য অলঙ্কার।

ক্রন্দন করোনা প্রিয়ে        হৈমপুরী ধনি,
সমরেতে জিতেছে সে      বীর চূড়ামণি।
ক্ষিপ্ত কণ্ঠে চিত্রাঙ্গদা        বলেন, রতন
দিয়েছিল দেব মোরে,       রক্ষার্থে যতন
আপনাকে দিই, পাখি       যেমন শাবকে
রাখে লুকিয়ে কোটরে,      বলুন পুত্রকে 
রেখেছেন কোন্ খানে?     প্রজাগনে  রক্ষা
নৃপ ধর্ম। তবে কেন           পেলোনা সুরক্ষা!

পুত্র আমার হায় রে!        বিধির কেমন
বিচার! রাঘব ক্ষুদ্র           নয়  বলে মন,
যাঁর নামে শিলা ভাসে      সমুদ্র  মাঝার
ঈশ্বরীয় হবে কেউ           ঐশ্বর্য অপার।
বশিভূত কপি জাতি        করছে সমর,
মানুষ নয় দেব সে,          নিশ্চিত অমর।
হয় যদি দেবতা সে          ভাগ্যবান মানি,
ভগবান হস্তে বধ             সদা শুভ জানি।

রূপা বাড়ৈ-- গল্প ও কবিতা --

রূপা বাড়ৈ-- গল্প ও কবিতা --

গল্প -- 

কে তিনি  

আজ সারাটা দিন ছিলো খুব ব্যস্ততাময়, আজ যেন অনেক কাজ আমার, কাজ করছি কিন্তু কেন যেন এগিয়ে যেতে পারছি না, পিছিয়ে পড়ছি, আর যেটাই ধরছি সেটাই বার বার হাত ফসকে পরে যাচ্ছে। তবুও কাজ করে যাচ্ছি, আজ যেন সব কাজ শেষ করতে হবে। মনে হচ্ছে জীবনের পাট সাঙ্গ হতে চলেছে, রান্না করবো বলে গেলাম রান্না ঘরে, গিয়ে দেখি জল নেই কলসিতে, খালি কলসি নিয়ে পুকুরে গেলাম জল আনতে, ঘাটে কেউ ছিলো না, জল ভরতে ভরতে তাকিয়ে দেখি অনেক মহিলারা এসে এক সাথে বলছে আমার কলসটা ভরে দাও, আমি বললাম সবাই লাইন দাও, ওদের এক এক করে জল ভরে দিতে দিতে আমার রান্নার সময় গেলো পেরিয়ে তবুও কেউ ছাড় দিলোনা, কি অলস মহিলা এরা, এসব ভাবতে ভাবতে কলসি নিয়ে বাড়ী এসে কলস রাখলাম ঘরে, হঠাৎ একটা শব্দ পেয়ে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে, আকাশে তাকিয়ে দেখি হাজার হাজার দূতগন নীল আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে তাঁরা সবাই সাদা পোশাক পরে আছে। দক্ষিণ পূর্ব কোণে একটা বিশাল তারা আর দক্ষিণ পশ্চিম কোণে একটি যাবপাত্রে একটি শিশু শুয়ে আছে, আর উত্তর পূর্ব কোণে একজন জ্যোতির্ময় পূরুষ আকাশ থেকে নেমে এসেছে, মধ্য আকাশে, শূন্যে। আর সকল স্বর্গদূত তাঁর চতুর্পাশে দাঁড়িয়ে তূরী বাজাচ্ছে আর মিষ্টি সুরে প্রসংশার গান গাইছে। আর বলছে তাঁরা  উচ্চ রবে, উর্ধ লোকে ঈশ্বরের মহিমা পৃথিবীতে তাহার প্রীতির পাত্র মনুষ্যদের মাঝে শান্তি। আমি আর উর্ধ্বে  তাকিয়ে থাকতে পারি নাই, মস্তক নত হয়ে এলো হাত দুটি এক হয়ে এলো প্রণাম জানালাম তাঁকে। আর একটাই রব এলো মুখে, আমায় সকল পাপ হতে মুক্ত করো হে ত্রাণকর্তা, আমি সকল পাপ হতে মুক্তি চাই, আমার পাপ ধরে তুমি বিচার করো না, ক্ষমা করো আমায়। আর তুলে নেও তোমার পবিত্রগনের কাছে, আমি যেতে চাই, তোমার কাছে তোমার স্বর্গধামে। তোমার ঐ কোমল মসৃণ পবিত্র হাত ধরে যেতে চাই তোমার সাথে, সকল স্বর্গদূত গণের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে তোমার নাম প্রশংসা করতে চাই।


কবিতা -- 

সঙ্গম --

পূর্ণতা পায় জল ঝরে পরা বৃষ্টির ফোঁটাতে
বাষ্প কণায় কঠিন মেঘ হয় যখন আকাশে,
মেঘেমেঘে কঠিন ঘর্ষণ হয় তখন রেগেমেগে 
বিদ্যুৎ চমকিয়ে ঝরে বর্ষা তৃপ্ততায় জেগে।

সাগরের সাথে আকাশের হয় প্রেমের সখ্যতা
দু'টি মোহনার মিলন মেলা আনে জলে পূর্ণতা,
সব জল ঐক্যবদ্ধ করে তরঙ্গ ঘূর্ণিপাক তোলে
স্রোতের টানে সমূলে তরঙ্গ যায় গভীর অতলে।

পাহাড়ের অবস্থান একটা থেকে অন্যটা দূরে
সাগর-আকাশ বাঁধা থাকে একই সুরের সুত্রে,
সাগরের জল আকাশের নীলে একাকার হয়ে
নীলাঞ্জনার রঙ হয়ে চিত্র আঁকে রংধনু ছুঁয়ে।

তোমার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রোদ, পূর্ণিমার জ্যোৎস্না 
ভেসে থাকা নাও বেঁধে অন্তরে এলো সুখের বার্তা,
বিদ্যুৎ চমকানো ঘর্ষণে যদি অগ্নি যেতো পাওয়া
মেঘ হয়ে ভেসে যেতাম দূরে, হতে যদি হাওয়া। 

প্রেমিক দৃষ্টি নিয়েছি খুঁজে তোমার ঐ দু'টি চোখে 
হৃদয়ের সঙ্গোপনে তৃপ্তির ইশারা দেখেছি সম্মুখে,
তোমার জন্যে নিজেকে সাজিয়েছি মেঘের জলে
প্রেমে পূর্ণ হয়ে কষ্ট পাথর চূর্ণ করে চলেছি সুখ কূলে।

কবিতা -- চাওয়া -- শিখা মালিক

কবিতা -- 

চাওয়া -- 
শিখা মালিক

শরীর ত্যাগী আমি শুয়ে থাকবো 
তোমার দেহের উপর,
শুয়ে থাকবো অনন্তকাল ধরে-
শুয়ে থাকবো আলোক প্রাপ্তির
 মরিচীকায়।
শুয়ে থাকবো দিন রাত্রির অমৃত 
কলস বুকে নিয়ে।
নীরব চোখে দেখবো অগনিত
পরিযায়ী নক্ষত্রদের আকাশ
 পার হয়ে যাওয়া ।
প্রানহীন শরীরে অগ্নিশ্বরের সাথে 
প্রেমের মত্ততায় রচনা করবো নতুন ইতিহাস।
আমি  অন্ন বস্ত্র বাসস্থান নিয়েছিলাম 
কিছুদিনের অভিনয়ের জন্য। 
অবক্ষয়ের  ইতিহাস করুক ফিসফাস,
পৃথিবী  --  তবুও  প্রাণহীন আমি শুয়ে থাকবো 
তোমার বুকের  উপর

কবিতা -- ফিরিয়ে দাও--সৌদামিনী শম্পা

কবিতা --  ফিরিয়ে দাও সৌদামিনী শম্পা  ছেড়ে এসেছি দিনগুলো অতীতের ছায়ামাখা পথে। শান্ত শীতল দিন, ঝড়হীন, দোলাচলহীন, বড় অমলীন সে ...