Saturday, 22 October 2022
কবিতা -- ফিরিয়ে দাও--সৌদামিনী শম্পা
Tuesday, 18 October 2022
গল্প --সপ্ন যখন সত্য হয়--সামিমা ইয়াসমিন
সপ্ন যখন সত্য হয়সামিমা ইয়াসমিন
গল্পটি শুরু হয় তানিয়া নামে একটি মেয়ের নেতৃত্ব দিয়ে যে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি ভালো কলেজে পড়ে। আর এই কলেজে অনেক ধনী ঘরের ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। কিন্তু খুবই কম ছাত্র-ছাত্রী আছে যারা গরীব ঘরের তবে তারা স্কলারশিপ এর মাধ্যমে এই কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। আর তাদেরই মধ্যে তানিয়া হলো একজন।
তার বাবা একটি কোম্পানিতে শ্রমিকের কাজ করে এবং মা গৃহকর্ত্রী। পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে খুব কষ্টে তাদের পারিবারিক জীবন যাপন চলে। এমনকি তানিয়া নিজে একটি কেকের দোকানে কাজ করে যাতে করে তার পড়াশোনার খরচা তুলতে পারে এবং তাদের পারিবারিক আর্থিক সমস্যা দূর করতে পারে। তবুও তাদের এই দারিদ্রতা দূর হয় না। তার একটি ছোট ভাইও আছে, হামিদ। সে এখন ক্লাস টেনে পড়ে। তার ছোট থেকে একটা ইচ্ছা আছে যে সে বড় হয়ে একজন রিপোর্টার হবে । কিন্তু সে তার দিদির মত অতটা পড়াশোনাতে ভালো নয় তাই সে ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ পাইনি। কিন্তু তানিয়া ছোট থেকে মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে সে বড় হয়ে একজন লেখিকা হবে। আর ছোট থেকেই তার এই লেখার অভ্যাস টি তাকে আরও উদ্যোগী করে তুলেছে। যখন সে একা কোথাও বসে থাকে তখন সে শুধু ভাবে আর তার মনের কথা কলমের দ্বারা খাতায় প্রকাশিত হয়।
উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর কলেজে ভর্তি হয়েছিল কিন্তু তখন চারিদিকে করোনা ভাইরাসের মহামারী ছড়িয়ে পড়ার কারণে কয়েক মাস লকডাউন ছিল। সরকারের তরফ থেকে বাড়ির বাইরে বেরোনো নিষেধ ছিল তাই সে বছর পড়াশোনাটাও খুব ভালো হয়নি। কিন্তু অনলাইনে পরীক্ষা হওয়ার কারণে বেশিরভাগ সবাই পাস করে গেছে। তবে এখনো পর্যন্ত ফার্স্ট সেমিস্টারের রেজাল্ট বের হয়নি। আর সরকার থেকে রীতিমতো সবাইকে ভ্যাকসিন দেওয়ার কারণে করোনা ভাইরাসের মহামারী আপতত দূর হয় এবং স্কুল-কলেজ সব খুলে দেয়। তারপর রীতিমতো পড়াশোনা শুরু হয় তানিয়াদের ও কলেজ খুলে দেয় এবং কলেজ থেকে একটা নোটিশ দেয় তাতে লেখা থাকে —
“ এতদ্বারা কলেজের সকল ছাত্র-ছাত্রীদের জানানো হচ্ছে যে, বিগত দুবছর ধরে অতিমহামারীর সংকট কাটিয়ে মহাবিদ্যালয়ের নিয়মিত পঠন-পাঠন বর্তমানে অনেকটা স্বাভাবিক হওয়ার পূর্বের ন্যায় বর্তমান ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে কলেজের বার্ষিক পত্রিকা ‘নবাঙকুর’ প্রকাশ করা সম্ভব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পত্রিকার জন্য সকলকে নিম্নলিখিত বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় লেখা জমা দেবার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
বাংলা ভাষায় লেখা যেকোনো ধরনের রচনায় আকাদেমি বানান বিধি অনুসরণ করতে হবে এবং লেখার শেষে নিজ স্বাক্ষর দিতে হবে। লেখার মধ্যে কোনরকম নকল থাকলে বা কারো লেখা হুবহু তুলে এনে জমা দেওয়া হবে যাবে না। কেবলমাত্র উপযুক্ত লেখাগুলি পত্রিকায় প্রকাশিত হবে। পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা গুলির মধ্যে তিনটি বাছাই করা লেখার রচয়িতাদের পুরস্কার প্রদান করা হবে বলেও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। লেখা জমা দেবার শেষ তারিখ ১৫ ই এপ্রিল ২০২২। ”
তানিয়া এ ব্যাপারে খবর পাই যে কলেজে নোটিশ দিয়েছে কিন্তু কী নোটিশ দিয়েছে তা জানেনা। সে রোজকার মতো সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং ব্রেকফাস্ট করে কলেজের ইউনিফর্ম পড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর সবার প্রথমে কেকের দোকানে গিয়ে তিন ঘন্টা দোকান সামলায়। তারপর কলেজ যায়। দোকানের মালিক তানিয়াকে তার নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসে। তাই তাদের মধ্যে সম্পর্কটি বেশ ভালোই আছে।
আজকে নোটিশ দেওয়ার খবর শুনে সে একটু তাড়াতাড়ি দোকান থেকে বেরিয়ে পরে । তারপর কলেজে গিয়ে সে দেখে যেখানে নোটিশ টাঙানো রয়েছে সেখানে অনেক ভিড় লেগে আছে এবং সে কলেজের ছাত্র- ছাত্রীদের মধ্যে ঘেঁষাঘেঁষি তে নোটিশটি পরে। নোটিশটি পড়ে তার মনে একটা আসা জাগ্রত হয় এবং মনে মনে ভাবে সে তিনজনের মধ্যে একজন হবে যাদের পুরস্কার দেওয়া হবে। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ যেন তাকে ব্যঙ্গ করে বলে “তুই এটার স্বপ্ন দেখিস না, তোর জন্য এই পুরস্কারটা নয়” কথাটা শুনে তার মনে একটু দুঃখ হলো তবুও সে কারো কথায় কোন কান না দিয়ে নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখল ।
৩ নং রুমে ইংরেজি অনার্স এর অপর্না ম্যামের ক্লাস হচ্ছে। ক্লাসে ম্যামও নোটিশটির ব্যাপারে আলোচনা করল। ক্লাসে বসে তানিয়া ভাবছে সে কী বিষয়ে গল্প লিখবে এবং সে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পরে। কিছুক্ষণ পরে ম্যামের আওয়াজে তার অন্যমনস্কতা ভাঙলো। “ কী হয়েছে, এত অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছো কেন? ”তানিয়া তখন ঘাবড়ে গিয়ে বলল গল্প লেখার ব্যাপারে ভাবছিলাম । এ কথাটি শুনে পাশে ছাত্রছাত্রীরা তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করতে শুরু করলো । তারপর ম্যামের বকুনিতে সবাই চুপ করল এবং বলল— "গল্প লিখবে ঠিক আছে কিন্তু এত অন্যমনস্ক হয়ে পড়লে হবে না। তুমি একটু বেশিই ভাবো, ঠিক আছে বসে পর।"
ক্লাস শেষ হবার ঘন্টা পড়ল এবং ম্যাম ক্লাস থেকে বেরিয়ে পড়ল আর সে তখনও ভাবছে সে কী লিখবে । আজ পর্যন্ত সে বিভিন্ন রকম গল্প লিখে এসেছে এবং সেগুলির মধ্যে বেশিরভাগই প্রেমের কাহিনী তবে এখন সে আলাদা ধরনের লিখতে চায়।
কলেজ ছুটি হল এবং তাকে তার বান্ধবী পিছন থেকে ডাকছে । তার নাম জিনিয়া কিন্তু সে বাংলা অনার্স নিয়ে পড়ে । ছুটতে ছুটতে এসে বলল “ কলেজের পাশে একটি বই মেলা বসেছে চল গিয়ে দেখে আসি ”। তারা দুজনে বই মেলায় গেল । মেলা ঢোকার প্রবেশ দরজায় লেখা আছে ‘ সাগরদিঘী বইমেলা ’ । আর সেই মেলায় বিভিন্ন রকমের বইয়ের দোকান আছে এবং একটা দোকানে এক এক রকমের বই আছে। কোনোটা ভূতের গল্পের বই আবার কোনোটা হাসির গল্প , প্রেমের গল্প ইত্যাদি। তানিয়া একটি বই কিনল। সেটিতে প্রেমের কাহিনী লেখা আছে কারণ সে প্রেমের গল্প পড়তে খুব পছন্দ করে। আর জিনিয়া একটি ভূতের গল্পের বই কিনল কারণ সে বাড়ীতে বেশীরভাগ সময় ভূতের সিনেমা দেখে । তারপর তারা দুজনে ফুচকার দোকানে গিয়ে ফুচকা খেল। তখন জিনিয়ার মোবাইলে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এলো এবং সেই ফোনটি কেটে দিয়ে মোবাইলটি সুইচ অফ করে দিল। তার মোবাইলে প্রায় অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসে এবং তাকে বিরক্ত করে। কিন্তু তাদের কাউকে পাত্তা দেয় না কারণ সে আগে থেকেই রিলেশনশিপে আছে । অন্যদিকে তানিয়াকে অনেকজনই প্রপোজ করেছে কিন্তু তাদের কাউকেই সে পাত্তা দেয়নি কারণ এসবের জন্য তার সময় নেই । আর তার এই ভাঙ্গা মোবাইলে কেই বা ফোন করবে । কারণ সে এতটাই গরীব যে মোবাইল ঠিক করার জন্য তা কাছে টাকা নেই । তাই তার মোবাইল শুধু বারে বারে সুইচঅফ হয়ে যায়।
মেলা দেখার পর তারা দুজনে বাড়ি চলে যায়। জিনিয়া আর তানিয়ার বাড়ি একই দিকে নয় তাই তারা বিপরীত দিকে চলে যায়। বাড়ি আসার পথে তানিয়া মনে মনে ভাবে সে কত গরিব ,তাকে শুধু টাকার জন্য কাজ খুঁজে বেড়াতে হয় আবার তাকে পড়াশোনাও করতে হয় । তার জীবন শুধু দুঃখে পরিপূর্ণ।
তারপর সে বাড়ি আসার পরে অন্যমনস্ক হয়ে কিছু কথা না বলে সোজা ঘরে ঢুকে যায়। মা দেখে আশ্চর্য হয় এবং তাকে খাওয়ার জন্য ডাকে। সে হাত মুখ ধোয়ার পর খেতে বসে । তার মা বলেন “ কী হয়েছে ,কি ব্যাপার চুপচাপ আছিস কেন ? অন্যদিন তো খুব বকিস ”। সে মাকে নোটিশটির ব্যাপারে সব কথা বলল। শোনার পর মা তাকে বললো “ তোকে কারো কথায় কোন কান দিতে হবে না তুই শুধু নিজের উপরে বিশ্বাস রাখ ,আমি জানি তুই পারবি ”। তখনই মনে মনে ঠিক করে ফেলল সে কি গল্প লিখবে এবং সে তারই জীবন কাহিনী নিয়ে একটা গল্প লিখল।
আজ রবিবার ,কলেজ ছুটি। তাই সে দুপুরবেলায় ঘরে বসে তার লেখা গল্পটি বারে বারে পড়ছে এবং মাঝে মাঝে একটু লজ্জা বোধ করছে। সে ভাবছে তার গল্পটা শুনে কেউ আবার হাসবে না তো! যদি এ ব্যাপারটা অতটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও গল্পের শিরোনাম দেওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে এখনও ঠিক করতে পারেনি যে গল্পটির কী শিরোনাম দেবে। এবং সে এটা নিয়ে অনেক সমস্যায় পড়ে গেছে।
যাইহোক ,গল্পের শিরোনাম নিয়ে যে সমস্যাটি ছিল সেটি দূর হয়ে গিয়েছে কারণ সে ঠিক করে ফেলেছে কী শিরোনাম দেবে। তারপর সে সেটি কলেজে জমা দিয়েছে।
আর কয়েকদিন পর সেই তিনজনের নাম ঘোষণা করবে যাদের লেখা সবথেকে সুন্দর হয়েছে। দিন গোনা শেষ হলো এবং তিনজনের নাম ঘোষণা করা হলো। সেই তিনজনের মধ্যে তার নামও ছিল।
এইসব শুনে তার তো খুশির সীমা নেই। তার সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়। যে পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল সেটি বাড়ির সবার হাতে হাতে ঘোরে এবং একবার করে বলে ,বাঃ চমৎকার লিখেছে তো !
পত্রিকার সুচিপত্রে নামও ছিল। ছোটবেলা ( গল্প )তানিয়া সুলতানা।
আর তানিয়া এবং বাকি দু'জনকে কলেজ কর্তৃক পুরস্কার দেওয়া হল তাদের মধ্যে একজনের নাম ছিল রহিম মণ্ডল এবং আরেকজন সৌমিত্র চক্রবর্তী।
সামিমা ইয়াসমিন
কবিতা --আয় কমলা আয় বিমলা শ্রীকান্ত মাহাত
শ্রীকান্ত মাহাত
আয় কমলা আয় বিমলা
নদীতে স্নান করি।
নদীর জলে অবগাহন
আমরা জলপরী।
দুই পাড়েতে বন বিথীকা
মাঝে বালুর চর।
বালুর চরে খেলবো মোরা
বেলা দুই প্রহর।
খিদে লাগলে খাবো আমরা
গাছের পাকা ফল।
বাড়িতে আছে দাদু দিদিমা
আশায় আছে বল।
গামছা দিয়ে মাছ ধরবো
সাঁঝে হবেক ঝোল।
খাবার খেয়ে শুয়ে পড়বো
বোল হরি বোল।
গল্প --অবশেষে সে আমার প্রেমিকা--শাবলু শাহাবউদ্দিন
কবিতা -- কিছুক্ষণ--অঞ্জলি দে নন্দী, মম
Saturday, 15 October 2022
অণুগল্প -- কণ্যা--চন্দ্রাণী গুপ্ত ব্যানার্জি
Wednesday, 12 October 2022
জয়িতা ভট্টাচার্যর গল্প ও কবিতা --
স্মৃতিশেখর মিত্রের গল্প ও কবিতা --
Sunday, 9 October 2022
সম্পাদকীয়--
প্রকৃতির মাঝে আমরা সব কিছু খুঁজে পেতে পারি--আনন্দ সুখ দুঃখের বীজ তো তার মাঝেই লুকিয়ে থাকে।
সুখ দুঃখ হাসি কান্না এ সব কিছু জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আর আমাদের মনের মাঝেই তো এ সবের নিবাস।
প্রচন্ড দাবদাহের মাঝ থেকে যখন শীতল হাওয়ার এক ঝোঁকা গায়ে এসে লাগে আমরা যেন সুখের ছোঁয়া পেয়ে যাই। তেমনি অনেক সময় স্মৃতির পাতা থেকে আমরা দুঃখকে টেনে আনি। বস্তুত মন খালিস্থান ধরে রাখতে পারে না। সে স্থানও তার ভরাট চাই। নিদ্রার মাঝে তাই বুঝি স্বপ্ন ঢুকে যায়, সে স্বপ্ন আমাদের মনের সুখ কিংবা বেকার ছাড়া আর কিছু নয়।
পূজোর রেস এখনো চলছে, সামনে আসছে দীপাবলী উৎসব। সব উৎসবের মাঝে আমাদের ভেতরের উৎসব, মানে, মনের উৎসবটাই সবচেয়ে বড় উৎসব। আর একে মনের মাঝে উজ্জীবিত করে রাখার চেষ্টাই বড় কথা।
আসুন আমরা আপাতত কিছু করি, প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখি কিংবা বাতায়নে বসে কিছু পড়ি। মানুষের মন মানসিকতা নিজের মনের মাঝে জড়িয়ে নিয়ে অন্যের সুখ দুঃখের সহভাগী হই। আকাশের মত উদার হলে আমাদের জীবন চলে না, তাই সাঁঝের মাঝে চাঁদ আবির মাখে। না তাকে কখনো রক্তরাগ ভাববো না। আসুন আজ আমরা স্ব-বর্ণ উৎসব সংখ্যার পাতা উল্টাই--দু-একটি কবিতা গল্প পড়ি--উৎসবকে মাথায় রেখে জীবনের কিছুটা সময় না হয় পার করি। ধন্যবাদ--তাপসকিরণ রায়।
গল্প -- নষ্ট বসন্ত -- তাপসকিরণ রায়
নষ্ট বসন্ত
তাপসকিরণ রায়
সখী ভাবনা কাহারে বলে...সখী যাতনা কাহারে বলে...তোমরা যে বল দিবস-রজনী ‘ভালবাসা’,‘ভালবাসা’...কখনো কি মনে হয় ভালবাসা এক ধরনের মনের রোগ ?
বরেন আর দশটা ছেলের মত সাধারণ একটি ছেলে। যৌবনে পা ছুঁয়েছে সে। রঙ্গিন তার চোখ। সুন্দরের মাঝে আলাদা ভাবে কিছু খুঁজে নেবার নেই--কালোর মাঝে সুন্দর খুঁজে নিতে হয়। বয়সের রং পারে তাকে দেখে নিতে !
বরেনের এমনি একটা মেয়েকে ভালো লাগত। দেখতে খুব কালো, কিন্তু তার মুখশ্রী বড় সুন্দর ! চোখ দুটি নাকি তাকে সবচে বেশী আকর্ষণ করে। ওই স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান ভুলেছে বরেন। মেয়েটি তার মার সঙ্গে মাঝে মাঝে আসে। ওরা বর্তন বিক্রি করে। অনেক সময় পুরনো কাপড় চোপড় বদলে বাসন দিয়ে যায়। মাসে একবার ওদের আনাগোনা থাকেই। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ডাক দিয়ে ওঠে, বর্তন লিবে, বর্তন ? পুরানা কাপড়া দিবে আর বর্তন লিবে !
ওরা অবাঙ্গালী, টুটাফুটা বাংলা বলতে পারে। আসলে ওরা রাজস্থানি--কোথাও অস্থায়ী ডেরা পেতে কয়েক মাস থাকে, কিছু রোজগারপাতি করে চলে যায়। ওই বর্তনবালীর মেয়েটার সঙ্গে দু বছর আগে দেখা বরেনের। কত বয়স হবে--বারো কি তের। ছিমছাম চেহারা--কালোর মাঝে বেশ তূলি আঁকা শরীর যেন। ক্ষুরধার চেহারা যাকে বলে। জ্বলজ্বল উজ্জ্বল দুটি চোখ, অন্তত বরেনের মনে হয়েছে, পৃথিবীর সমস্ত মায়া যেন ওই চোখ ধরে আছে !
--কি নাম তোমার ? একদিন আড়ালে মেয়েটিকে পেয়ে বরেন জিজ্ঞেস করেছিল।
হেসে ছিল মেয়েটি--মায়াময় হাসি। একটু সময় নিয়ে উত্তর দিয়েছিল, ঝিনুক--
বাহ, ঝিনুক, এত সুন্দর নাম হয় কারো ! বরেন যেন টালমাটাল।
অপেক্ষার পর যখনই দেখা হয় এমনি ধরনের একটা দুটো কথা হয়। ঝিনুক ধীরে ধীরে বেশ বড় হয়ে গেছে। ওর মধ্যে লজ্জা লজ্জা ভাব জমে গেছে পুরোদমে। বরেন আলতো পায়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। ঝিনুক জানে বরেন ওর জন্যেই বেরিয়ে এসেছে। দুজনের মুখেই হাসির ছোঁয়া লেগে যায়। কি কথা বলবে বরেন যেন খুঁজেই পায় না !
বরেনের সাথে প্রায় প্রতিমাসে দেখা হয় ঝিনুকের। এমনি প্রায় দুটো বছর কেটে গেছে--ওরা দস্তুর মত প্রেমিক-প্রেমিকা বনে গেছে। বরেন জানে, কোথায় থাকে ঝিনুক। শহরের শেষ প্রান্তে ওদের ডেরা। ছেঁড়া জোড়াতালি দেওয়া তাঁবুর নিচে ওদের বাস। প্রায় দিন ঝিনুক চলে আসে সেই নিরালায়--যেখানে বরেন তাকে আসতে বলে। সেই ছোট নদীটির পারে--যেখানে ঝোপ, ঝাড়, জঙ্গলের আড়াল রয়েছে।
--ভালোবাসি ঝিনুক তোকে--
--হামি ভী ভালোবাসি টুকে--প্যায়ার করি--কিন্তুক তুই তো হামারে বিয়া করবি না, জানি--
কেন ?
--হামার মা বাতিয়েছে--তুদের সাথ মোদের বিয়া হবার লয়--
--কেন রে ! প্রেমের বিপাকে পড়ে বরেন অন্ধ--তার সত্তা হারিয়েছে। বয়সের সমস্ত রং ফেলে তার চোখে জমে আছে কালো, অন্ধত্বের রং !
আমি তোকে বিয়ে করবো--আমি তোকে ছাড়া বাঁচব না রে ঝিনুক ! ঝিনুকের হাত বরেনের হাতে, ঝিনুকের মুখ বরেনের মুখের একেবারে ছুঁইছুঁই পাশটিতে, উভয়ের বাষ্পায়িত শ্বাস উভয়ের মুখমন্ডলে স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছে--ওরা চুপচাপ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে--নিষ্পলক।
ঝিনুকের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসছে, মা বইলেছে,তুদের সঙ্গে হামাদের বিয়া হোয় না রে--
হয়, হয়, হয়, বরেন প্রেমাবেশে জড়িয়ে ধরে ঝিনুককে।
ঝিনুকের মা একদিন বাধা দেয় বরেনকে, সাবধান করে দেয়, আমার লেড়কীর দিকে তু হাত বাড়াবি না বাতিয়ে দিলাম !
বরেন কিছুতেই শুনতে চায় না--ঝিনুকের মা বলে, হামাদের অন্দর ভালবাসা বইলে কিছু নাই--তুর যুদি ঝিনুকের সঙ্গে এত প্যায়ার তবে তুকে হামি বাতাই দিই, হাজার টাকা হাতে লিয়ে তবে হামাদের ডেরায় আসবি--
সেদিন বরেন বাবার রাখা মায়নার টাকা থেকে এক হাজার টাকা সরিয়ে নিলো। আর ভর দুপুরে গিয়ে হাজির হল ঝিনুকদের ডেরায়। ঝিনুক আর তার মা ঘরে ছিল। বরেনকে দেখেই ঝিনুকের মা বলে উঠলো, কি খবর ?
চাপা স্বরে বরেন বলে ওঠে, টাকা এনেছি।
এনেছিস ? দে দেখি—
বরেন হাজার টাকা ঝিনুকের মার হাতে তুলে দেয়।
ঝিনুকের মা ঝিনুকের দিকে তাকায়, ঝিনুক চাপা স্বরে কেঁদে উঠে, না লা লা...
--ঝিনুকের মা ঝিনুকের দিকে লাল চোখ নিয়ে বলে উঠলো, যা বাতিয়েছি তাই করবি--মনে থাকে যেন—তারপর বরেনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, তুদের একলা ডেরাতে ছেইড়ে দিলাম...হামি এক ঘণ্টা বাদে আসব...তরা যত পারিস প্যায়ার-ভালবাসা কইরে নে--
ঝিনুক কাঁদছে--হামাদের কুনো প্যায়ার নাই--নেও তুমি হাজার টাকা দিইয়েছ--হামার শরীল তুমাকে দিলাম--তুমি আমারে আদর করো...জড়াইয়া ধরো...আমারে ভালোবাসো...
বরেনের মুখ থেকে কোন কথা সরল না--সে ঝিনুকের মুখোমুখি হয়ে নিশ্চল ভাবে দাঁড়িয়ে থাকল।
সমাপ্ত
গল্প -- বাঘিনীর সঙ্গে প্রেম --শংকর ব্রহ্ম
গল্প --
বাঘিনীর সঙ্গে প্রেম --
শংকর ব্রহ্ম
------------------------------
আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি যে এটা একটা বাঘিনী ছিল। আমি তার গড়গড় আওয়াজ শুনেছিলাম শুধু।
আমার বাড়ির ভেতরের প্রবেশের পথটি খোলা ছিল, আমি দেখলাম সে সেখান দিয়ে ঢুকেছিল। ঢুকেই সে এদিকে সেদিকে দু'একবার তাকাল। ভাবলো একটু কিছু । তারপর
আমার ঘরে ভিতর অন্ধকারে সে এসেছিল, এসে আমার পাশে এসে শুয়ে পড়ল, আধো আলোতে দেখে আমি পরে চিনলাম এটা একটা বাঘিনী।
শুয়ে পড়ে সে গভীর এবং স্বাভাবিক শ্বাস নিচ্ছিলো এবং শীঘ্রই ঘুমিয়ে পড়ল, মনে হলো। তার গা থেকে লতা পাতার ভেজা তাজা গন্ধ আসছিল। একটি বন্য প্রাণীর গন্ধ যা আমাকে ভীষণ সম্মোহিত করে দিয়েছে। আমি এটা বলতে পারি যে সে রাতে একটি বাঘিনী আমার বাড়িতে এসে আমার পাশে শুয়ে পড়ল। প্রথমে তার গা ভেজা ছিল, তার ত্বক থেকে আর্দ্রতা ছড়িয়ে পড়েছিল, যা আমার চারপাশে এক শীতলতার সৃষ্টি করেছিল।
আমার কাছে আসার জন্য অবশ্যই তার সাঁতার কাটার প্রয়োজন হয়ে পড়ে ছিল, কারণ কাছেই ছিল বড় একটা নদী, আর তার ওপারে বন।
শরৎকালের মতো শীতল বাতাস সমভূমি অতিক্রম করছিল এখানে আসছিল। গ্রীষ্মকাল এখনও বর্তমান এবং গরমের ভাবটাও তাজা আছে। বাতাস আসছিল দূরের নদীটা থেকে, এবং আমি তার জলজ গন্ধ নাকে টের পাচ্ছিলাম ভালভাবে।
রাতে আমিও ভাল ঘুমিয়েছি। বাঘিনীও ছিল চুপচাপ এবং মনেহয় ভাল ঘুম হয়েছে তার।
সকালের দিকে, উষ্ণতা ফিরে এসেছিল তাঁর শরীরে। যখন সকালে তার ঘুম ভাঙল, তখন সে ঘর থেকে বেরিয়ে, আমার বাড়ির সামনে বাগানে গিয়ে দাঁড়িয়ে
বড় নদীটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
আমি তাকে কাছে আসবার জন্য ইশারা করলাম
এবং আমি তাকে মাংস খেতে দিলাম।
আমি আশা করেছিলাম যে সে হয়তো কাছে এসে আমার সাথে কিছু কথা বলবে, কিন্ত সে ছিল নীরব। তবে সময়ে সময়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল ,তার চোখ দেখে মনে হচ্ছিল আমাকে তার কিছুই বলার নেই। অবশেষে. আমি তার সাথে কথা বলার প্রত্যাশা ছেড়ে দিলাম। অন্য কাজে ব্যস্থ হয়ে পড়লাম। সে সেখানেই বসেছিল।
তবে প্রায়ই আমি তার সাথে আমার ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করতাম এবং আমি ভাবতাম যে সে সেগুলো বুঝতে পারছে।
যে রাতে, বাঘিনীটি আবার আমার পাশে ঘুমিয়েছিল। তারপরের দিন সে বাড়ির পাশে আমার আম বাগানে দিন কাটিয়েছি সূর্যের বিপরীতে, ছায়ায় বসে। মাঝে মাঝে আমি ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেতাম, দূরের বনের আর নদীর দিকে তাকিয়ে। আমি তাকে দেখতাম নদীর ধারে দাঁড়িয়ে সে প্রবাহিত জলের দিকে তাকিয়ে থাকতো।
সেদিন আমি তাকে বলতে গেছিলাম,
'বেশ কিছুদিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে বাইরে যাব, তোমাকে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমার না থাকর সময়, তা বেশ কয়েক দিন ধরে চলতে পারে, তুমি বাড়ির ভিতরে বা বাইরে থাকতে চাও?
আমি দরজাটি তালাবন্ধ করব কিনা জানতে চাই। উত্তর না দিয়ে বাঘিনীটি শুয়ে পড়ল দ্বারপ্রান্তে, এবং আমি জানতাম যে আমার ঘর বন্ধ করার দরকার নেই, আমি চলে গিয়েছিলাম।
আমি ফিরে এসে দেখি, বাঘটি খোলা চোখে শুয়ে আছে। আমাকে দেখে সে উঠে বসল। কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর উদাস ভাবে দূরে তাকলো।
বাড়িটি যেমন ছিল তেমনি আছে। আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই এবং তার জন্য আমি কিছু মাংস নিয়ে এসেছি, তাকে জানাই। সে তার কোন প্রতি-উত্তর না দিয়ে আবার দরজার পাশেই শুয়ে পড়ে।
তার কিছুদিন পর আমি যখন নদীতে মাছ ধরতে যাই তখন সে প্রায়ই আমার সঙ্গে যেত। নদীর পাশে বসে থাকত। আমি যে মাছটি ধরতাম, তা মনোযোগ দিয়ে দেখতো।
যখন আমি বনের মধ্যে কাঠ কাটতে যেতাম (সেখানে সে ছিল) সে আমার সঙ্গে যেত এবং ফিরে এসে প্রতি রাতে সে আমার পাশে ঘুমাত।
তারপর একদিন সে ভোরের দিকে আমার বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেল ধীরে ধীরে এবং নিঃশব্দে।
যাবার আগে সে আমাকে একবার স্পর্শ করল আমাকে জাগাতে, এবং সে তাকিয়ে রইল আমার মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে. আমি বুঝিনি যে সে চলে যাবে , তারপর সে ধীরে ধীরে আমার বাড়ির দরজা দিয়ে বেরিয়ে, নদীর দিকে বৃষ্টিতে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল দেখে,
আমি সে দিকে তাকিয়ে রইলাম। সাঁতার কেটে নদীর ওপারে সে চলে গেল। তখন টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল।
আমি আর বিছানা ছেড়ে উঠিনি। পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, একটু পরেই সে ফিরে আসবে। কিন্তু আশ্চর্য, সে আর ফিরে এলো না।
আমি ভাবতে পারিনি যে চিরদিনের জন্য আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। জানতে পারলে , বুঝতে পারলে, হয়তো তাকে যেতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতাম।
আমি এখনও আশা করি যে সে আবার একদিন আমার কাছে ফিরে আসবে।
আমি আজকাল আর নদীতে মাছ ধরতে যাই না। কিংবা যাই না বনে কাঠ কাটতে। আমার যেন এখন আর কোন কাজ নেই। কোন কাজ করতে আমার আর ভালও লাগে না।
আমি এখন নদীর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকি, তার কথা ভাবি। যেদিন সে প্রথম এসেছিল, মনে পড়ে যায় সে কথা। আনন্দ যেন সে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে চলে গেছে।
আজকাল আমি ঘুমোতে যাওয়ার আগে, একবার হলেও ভাবি তার কথা, একদিন হয়তো সে ফিরে এসে আমার পাশে শুয়ে পড়বে। ঘুমের মধ্যে , আমি তার গাঢ় শ্বাস ফেলার শব্দে জেগে উঠে দেখব সে আমার পাশে শুয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। আমি আজকাল একা একাই শুয়ে থাকি । আর ঘুম আসে না রাতে , তার কথা ভাবতে ভাবতে ভোর হয়ে যায়। আমি বাইরে বেরিয়ে এসে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি। একটা কিছু সাতার কেটে আমার দিকে আসছে যেন দেখতে পাই। তারপর সন্ধ্যা নেমে এলে চরাচর জুড়ে, আমি হতাশ হয়ে বড়ি ফিরে আসি।
গল্প--মনের কোণে ধুলো --কবিরুল (রঞ্জিত মল্লিক )
ঊশ্রী মন্ডলের কবিতা --
কাব্য -- বীরবাহু বধ --রমা গুপ্ত
রূপা বাড়ৈ-- গল্প ও কবিতা --
কবিতা -- চাওয়া -- শিখা মালিক
কবিতা -- ফিরিয়ে দাও--সৌদামিনী শম্পা
কবিতা -- ফিরিয়ে দাও সৌদামিনী শম্পা ছেড়ে এসেছি দিনগুলো অতীতের ছায়ামাখা পথে। শান্ত শীতল দিন, ঝড়হীন, দোলাচলহীন, বড় অমলীন সে ...
-
কবিতা -- কাঁদে না মহামায়ার মন -- ডাঃ সুভাষ চন্দ্র সরকার ------------------------------------- বোধন হলো না; হলো বিসর্জন, মর্ত্যে...
-
স্মৃতি শেখর মিত্রের গল্প ও কবিতা -- গল্প -- প্রেম গয়া জেলার চৌপারনে ছত্তীশ যাদবের বাস। অত্যন্ত পরিশ্রমী ও সৎ মানুষ। গোয়ালা হি...
-
কবিতা -- ওই মেয়ে তুই-- ডঃ তাপস কুমার সরকার ওই মেয়ে তুই মরিস কেন ঘুরে কাঁধে নিয়ে বড় একটা ঝোলা ; বাড়িতে তোর মা বুড়ি থুরথুরে...
