গল্প --
প্রেম
গয়া জেলার চৌপারনে ছত্তীশ যাদবের বাস।
অত্যন্ত পরিশ্রমী ও সৎ মানুষ। গোয়ালা হিসাবে
তার সুনাম রয়েছে ঐ তল্লাটে। গোয়ালাদের
স্বভাবের কোন কিছুই ওর মধ্যে দেখা যায় না।
অন্যান্য গোয়ালাদের ধারণা দুধে জল মেলানো
তাদের জাতির ধর্মের মধ্যেই পড়ে।ঈশ্বরও
সেকথা মেনে নিয়েছেন। যেমন স্যাকরাদের
কাজ সোনায় খাদ মেশানো নইলে গয়না বানানো যায় না। সেই ছত্তীশ যাদবের বুড়ি
গাইটি শেষ বয়সে একটি এঁড়ে বাছুরের জন্ম
দেয় এবং ছত্তীশ যাদবের শত চেষ্টাতেও
গাইটিকে বাঁচানো সম্ভব হলো না।কন্যা সন্তানের
মতো সে তার বুড়ি গাইটিকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে। শীতের সময় থাকায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় তার তৈরী করা বড় বস্তার ঢাকা বাছুরের ও তার মায়ের শরীরে ঢাকা দিয়ে দেয় যাতে
তাদের ঠান্ডা না লাগে। সারা শরীর ঢেকে দিত
তাছাড়াও ঘুঁটে জ্বালিয়ে গাইটির শরীরে যাতে
গরম ধরে তার চেষ্টা করে। কিন্তু কোন প্রয়াসই তার কাজে এলো না। শেষ বয়সে বাচ্চা বিয়ানোর ধকল সহ্য করতে না পেরে তার মৃত্যু ঘটে।তার মৃত্যুতে ছত্তীশ যাদব কন্যা হারানোর
বেদনা অনুভব করলো।এ সংসারে ছত্তীশের
নিকট আত্মীয় বলতে কেউ নেই। একটি বোন
ছিল তারও বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর একেবারে
একা হয়ে যায়।
বুড়ি গাইটি মারা যাওয়ার পর তার উপর সমস্ত
দায়িত্ব এসে পড়ে সদ্যজাত বাছুরটির। সারাদিন
বাছুরটি হাম্বা হাম্বা স্বরে ডেকে ডেকে মাকে খুঁজে বেড়ায়। ছত্তীশের নরম মনে গভীর বেদনার
সঞ্চার হয়।বাছুরটিকে কীভাবে বড় করা যায় সেই চিন্তায় সে ডুবে থাকে সারাদিন।নেহাৎ বাছুর মায়ের দুধ ছাড়া বাঁচে কেমনে!
তবু সে প্রতিদিন বাছুরটির খাওয়ানোর জন্য
এক পোয়া করে দুধের বন্দোবস্ত করে।গাইটির
বিয়ানোর পর তার আশা ছিল গাইটি থেকে
দোহানোর পর যে দুধ পাওয়া যাবে তাতে তার
নিজের খাওয়া দাওয়ার কিছুটা হলেও সুরাহা হবে কিন্তু হায় এখন তাকে অন্যদের কাছ থেকে
বাছুরকে খাওয়ানোর জন্য দুধের জোগাড় করতে হচ্ছে। ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছত্তীশের মন
যদিও কাতর হয় কখনো কেমনে তবু তার
ঈশ্বরের উপর আস্থা আবার বেড়ে যায়। ভাতের
ফেনা ও তার সঙ্গে ভুসি মিশিয়ে বাছুরের মুখের
সামনে ধরে।বাছুরটির খাওয়ার খুব কষ্ট হয়। কিন্তু
ধীরে ধীরে খেতে শিখে যায়। এভাবেই কোনমতে বাছুরটি বেঁচে যায়। ছত্তীশের মনের গভীর
আশঙ্কা দূর হয়।মুক্তি পায় তার নিত্যদিনের গভীর চিন্তা থেকে। এদিকে মাতৃহারা বাছুরটির
উপর তার স্নেহ ও ভালবাসা গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে তার অবলম্বন বলতে এ
বিশ্ব সংসারে ঐ বাছুরটি।তাই সে বাছুরটিকে
অতিশয় যত্ন সহকারে বড় করে তোলার চেষ্টা করে। প্রতিদিন পুকুরের জলে স্নান করায়।ওর
জন্য মাঠ থেকে কচি কচি ঘাস কেটে বোঝা
বেঁধে নিয়ে আসে। বাছুরটির পেছনে সময়
দিতে দিতে কখন যে তার দিন পার হয়ে যায়
সে বুঝতেও পারে না। রাতের বেলা কোন
রকমে নিজের জন্য চার পাঁচটি চাপাটি ও
সারাবছর খাওয়ার জন্য বানানো আমের আচার
ও কাটা পেঁয়াজ সহযোগে রাতের খাবার খেয়ে
আটটার মধ্যে শুয়ে পড়ে। শোওয়ার আগেও
একবার বাছুরটিকে দেখে আসে।এ ভাবেই
তার দিন কাটে এবং বাছুরটিও মোটামুটি
বড় হয়ে যায়।অবসর সময়ে যখনই বাছুরটির
সারা শরীরে হাত বোলায়।সে তার আদর
বুঝতে পারে এবং মাঝে মাঝে ছত্তীশের গায়ে
মুখে জিভ দিয়ে চাটতে থাকে। কখন যে
দুজনার মধ্যে গভীর স্নেহ ও ভালবাসার সম্পর্ক
গড়ে ওঠে বোঝাও যায় না। ছত্তীশের বয়স যখন সত্তর বছর পার হয়ে যায় তখন অনিয়মিত
খাদ্যাভ্যাসে অসময়ে বার্ধক্যের দোর গোড়ায়
পৌঁছে যায়।সে বুঝতে পারে আমার কাছে থাকলে বাছুরটি সময় মতো খেতে পাবে না।কে
তার দেখাশোনা করবে?তাই সে মনস্থির করে যে
অল্প মূল্যের বিনিময়ে ওকে পাশের গ্ৰামের এক
গোয়ালাকে বিক্রি করে দেবে কারণ তার ভগ্ন
স্বাস্থ্যের কারণে কবে যে তার মৃত্যু হবে তার ,সে
নিজেও জানে না।তাই তার ভালো চিন্তা করে
পাশের গ্ৰামের রামযতন গোয়ালার নিকট খুব
অল্প মূল্যের বিনিময়ে বেচে দেয় এবং ফিরে
আসার সময় বার বার অনুরোধ করে আসে
সে যেন বাছুরটিকে ভালভাবে রাখে। বাছুরটি
কিছুতেই অন্য গ্ৰামে যেতে চায় না।ও বুঝতে
পারে ওকে অন্য কোথাও রাখা হবে।যতবার
পৌঁছে দিয়ে আসে ততবারই কোন না কোন
ভাবে ছুটে চলে আসে ছত্তীশের কাছে। এভাবেই
কিছুদিন কেটে যায়। অতঃপর একদিন মাঝরাতে ছত্তীশের প্রচন্ড মাথা ব্যথা ও বমি শুরু হয় সঙ্গে জ্বর।
সবাই জানালো ওর ডেঙ্গুজ্বর হয়েছে। বাছুরটি
পরদিন ভোরেই ছত্তীশের ঘরে ঢুকে যায় যেখানে সে শুয়ে ছিল। তার বিছানার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে।অবলা বেজুবান প্রাণী কিছু বলতে না পারলেও বুঝতে পারে তার মালিকের
কিছু হয়েছে। শুধু হাম্বা হাম্বা করতে থাকে এবং
তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে আসে।সে প্রচন্ড
ছটফট করতে থাকে।ইত্যবসরে তার নতুন
মালিক এসে তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। সারা
রাস্তা সে হাম্বা হাম্বা রবে কাঁদতে কাঁদতে রামযতনের বাড়ি পৌঁছায়। রামযতন তাকে
বিচালী কেটে দেয় কিন্তু সে কিছুতেই খায় না।
এভাবে রাতভর মাঝে মাঝেই হাম্বা হাম্বা রবে
তার গভীর কষ্টের কথা জানান দেয়। একটি
অবলা প্রাণীর প্রেম যে মানুষের আপন সন্তানের
থেকে কখনও কখনও অনেক বেশি হতে পারে তা বেশ বোঝা যায়।
পরদিন সকালে সে ছাড়া পাবার সঙ্গে সঙ্গে
সিধা ছত্তীশের বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়।এসে
দেখে যে ছত্তীশের কোন নড়ন চড়ন নাই।
সে বুঝতে পারে তার মালিকের ভীষণ কিছু একটা হয়েছে। আশেপাশের প্রতিটি ঘরে হাম্বা হাম্বা রবে যায় আবার ছত্তীশের খাটের সামনে এসে দাঁড়ায়।ওর অস্থিরতা দেখে পাড়া প্রতিবেশীরা সবাই বুঝতে পারে হয়তো ছত্তীশের
কোন বড়রকম কিছু বিপদ হয়েছে যার জন্য
তার বাছুরের চোখে এতো ধারা বইছে এবং সে
উন্মাদের মতো হাম্বা হাম্বা রবে ডাক ছাড়ছে।
ওরা সকলে এসে দেখে ছত্তীশের হাত পা সব
বরফের মতো ঠান্ডা ও কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেছে। ওরা অনুমান করে যে সে হয়তো মাঝ
রাত্রে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।ওর তিন
কূলে কেউ না থাকায় গ্ৰামবাসীরা নিজেদের
মধ্যে আলাপ আলোচনা ক'রে তার দাহ সৎকারের জন্য তৈরী হতে থাকে তখন বাছুরটি
ছত্তীশের খাটের সামনে দাঁড়িয়ে স্থির দৃষ্টিতে
ছত্তীশের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কখনও
বা হাম্বা হাম্বা রবে ডেকে ওকে ওঠানোর চেষ্টা
করে। মুখের কাছে মুখ নিয়ে যেয়ে জিভ দিয়ে
মুখে জিভ ঠেকিয়ে উঠাতে চায়।যেন বলতে চায়
" তোমার কী হয়েছে, তুমি এখনও শুয়ে আছো
কেন? এবার তো ওঠো।"কিন্তু কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে ওর মালিকের খাটের পাশে বসে পড়ে।
দুটি বাঁশ দিয়ে যখন মড়াটিকে বেঁধে শশ্মানে
নিয়ে যাওয়া হয় তখন সে সমগ্ৰ গ্ৰামবাসীর
পেছন পেছন শশ্মানে এসে উপস্থিত হয়। একটা
গভীর অস্থিরতা তার মধ্যে ক্রিয়াশীল সেটা
গ্ৰামবাসীরা বেশ উপলব্ধি করে। ছত্তীশের মুখের
ঢাকা দেওয়া কাপড় বার বার উঠিয়ে ফেলে দিতে চায়।যেন বলতে চায় "তুমি আমাকে ফেলে
কোথায় যেতে চাও? অনেক হয়েছে এবার তো
ওঠো।"আবার পরক্ষণেই খাটের পাশটিতে বসে
বার বার হাম্বা হাম্বা রবে ডাক ছাড়তে থাকে। এবং যতক্ষণ না শব দেহটিকে অগ্নিকুন্ডের
মধ্যে শোয়ানো হয় ততক্ষণ সে ঠায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।মূক প্রাণী মানুষের
মতো ডাক ছেড়ে কাঁদতে পারে না কিন্তু এ
যেন এক গভীর শোকের ছায়া তাকে দেখেই বোঝা যায়।তার হাম্বা রবে এবং চোখের
সকরুণ দৃষ্টি শশ্মান যাত্রীদের মধ্যেও গভীর
কষ্টের আবহ তৈরি করে দেয়। ছত্তীশের মৃতদেহ
সম্পূর্ণরূপে দাহ না হওয়া পর্যন্ত সে একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। তার নীরব চোখের জল
সমস্ত শশ্মান যাত্রীদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়
সকলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।সমস্ত পরিবেশ
কান্নায় হাহাকার করে ওঠে।গ্ৰামের শশ্মান
ফল্গু নদীর তীরে হওয়ায় ফল্গু নদীও এই
দৃশ্যের সাক্ষী থেকে যায়।
কবিতা--
কুস্তি খেলার বন্ধু--
এখন অনেক রাত
বসে আছি প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে
আমার পাশে এসে বসলেন
এক দীর্ঘকায় সুপুরুষ ।
লম্বা কোঁকড়ানো চুল ,সুন্দর
একমুখ কালো কালো দাড়ি ।
আমি বিস্ময়ে হতবাক
আমার পাশে এসে বসেছেন
ইনি তো স্বয়ং" রবীন্দ্রনাথ "!
তিনি বললেন " বৎস! তুমি এসো
আমার সঙ্গে তোমার শেষ ট্রেন
আসার এখনও অনেকটাই দেরি আছে।
এসব জায়গায় তুমি আসোনি তো আগে
চলো তোমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি
প্ল্যাটফর্মের বাইরে কোথায় কী দেখার মতো আছে।"
তিনি তাঁর শক্ত মুঠোয় ধরলেন আমার হাত।
বললেন, " এ জায়গার কথা কী তোমার স্মরণে
আসে? আমি আর তুমি রোজ বিকেলে এসে
কতদিন কুস্তির মহড়া দিয়েছি; তুমি প্যাংলা হলে
কী হবে তোমার শরীরেও ছিল ভালোই তাগদ।
যদিও আমারই জিৎ হতো বরাবর"।
আমি বললাম, "তুমি কবে কুস্তির মহড়াতে ভাগ
নিয়েছো ! তবে তুমি এতো এতো গান ও কবিতা
লিখলে কেমনে?"আমার প্রশ্ন শুনে তিনি মৃদু হাসি হাসলেন। "সেসব গুঢ় রহস্যের কথা নাই বা শুনলে। তবে একথা জেনে রাখো, যতদিন
বেঁচে আছি তোমাকে আমার মনে থাকবে কুস্তি
খেলার পার্টনার হিসেবে।"
আমার শেষ ট্রেন আসতে দেখে তিনি জানালেন,
"এসো! তোমাকে ট্রেনে চড়িয়ে দিই। আমার
কথা তুমি অবশ্যই মনে রেখো, কবি হিসেবে নয়
শুধু কুস্তি খেলার বন্ধু হিসেবে।"
তিনি বললেন, "বিদায় বন্ধু বিদায়! এবার
তোমার সঙ্গে দেখা হবে সরাসরি কুস্তির আখড়ায়।"
No comments:
Post a Comment