আমি উলুপী
স্মৃতির কুঠূরিতে সে ঘটনাগুলি হায়..
আজও জ্বল জ্বল করে জ্বলছে মনভূমিতে স্বমহিমায় ,
দেখেছিলাম কুন্তী পুত্র বিশ্ব জয়ি সেই শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধরকে ;
এসেছিলো সে বনবাসে বিবাহের শর্ত লঙ্ঘনের কারণে ,
আমিও ছিলাম তারি অনুসরণে..|
স্নানরত অর্জুনকে মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম..
নিজের করে পাবার কামনায় বিবাহের প্রস্তাবও দিলাম ,
প্রথমে তিনি রাজি হতে চাচ্ছিলেন না কিছুতেই- কিন্তু..
আমার কথায়,যুক্তিতে অবশেষে রাজি হয়ে যান ;
এসেছিলো আমাদের মিলনের পুত্র ইরাবান..।
বাল্যকাল হতেই মাতৃগৃহে সে পালিত..
তাই নিজ পুত্রের কথা অর্জুন না জানতো ,
তৃতীয় পান্ডব তখন সুরলোকে নিচ্ছিলো অস্ত্র শিক্ষা একাগ্রচিত্তে ;
ইরাবান তাঁর নিকটে গিয়ে দিলো নিজ পরিচয়,
পরস্পর আর রইলো না অজ্ঞাতপরিচয়..|
মোর পুত্র দিয়েছিলো কথা পিতারে..
অবশ্যই আসবে যোদ্ধা বেশে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে প্রয়োজনানুসারে ,
চলল পুত্র পিতার আহ্বানে ভীষণ রণে অতীব বিক্রমে ;
ঝাঁপিয়ে পড়লো করলো নাশ নিদারুনে পান্ডব বিরোধীদের ,
নিলো নব পরিকল্পনা জেতাতে পান্ডবদের..|
কোনও বীরপুরুষ কালাপ্পালি প্রথার যুদ্ধে ..
দেবী কালীর সামনে নিজেকে উৎসর্গ করেন শুদ্ধে ,
বিশ্বাস কর, তবেই হবে সেই পক্ষের জয় অবশ্যম্ভাবী ;
ইরাবান পাণ্ডবপক্ষ থেকে উৎসর্গের ইচ্ছা প্রকাশ করে ,
নিজেকে বলি দিতে চায় অকাতরে..|
সন্তুষ্ট শ্রীকৃষ্ণ হতে তিনটি বর লভে..
একটি - যুদ্ধে বীরের মৃত্যু বরণ করা জয়লাভে,
দ্বিতীয়টি - আঠেরো দিনের যুদ্ধ পুরোটা দেখার সৌভাগ্য লাভ ;
তৃতীয়টি - দাহ না করা হয় ,মৃত্যুর পর,
এই রূপ ব্যবস্থাই রইলো অতঃপর..|
সে সময়ের রীতি ছিলো অন্যরূপ..
অনূঢ়দের মৃত্যুতে দাহর পরিবর্তে কবরস্থই ছিল সত্যরূপ ,
এই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় পর্যন্ত ইরাবান ছিলো অবিবাহিত ;
কোনও নারী তাঁকে চাইছিল না বিয়ে করতে ,
অতঃপর শ্রীকৃষ্ণ নিলেন উপায় ব্রতে..|
শ্রীকৃষ্ণ নারীরূপ ধারণে হলেন মোহিনী..
বিয়ের পড়ে মৃত্যুআগে একরাত কাটান হয়ে গৃহিনী ,
আরাবনের মৃত্যুর পর শ্রীকৃষ্ণ বৈধব্য বেশে করে শোকপালন ;
পরের দিন আবার আসল চেহারায় ফিরে আসেন,
এইভাবেই তিনি সকল শর্তপূরণ করেন..|
আত্মবলির পর বত্রিশ টুকরোর দেহাংশ ..
কালীর কাছে উৎসর্গ করা হয় সকলই খণ্ডাংশ ,
যুদ্ধক্ষেত্রে এক খুঁটির আগায় চড়িয়ে রাখা হয় কাটামুণ্ডু ;
সেখান থেকেই সমস্ত কিছু তার গোচরে আসে
তাঁর ,
আকাশে বাতাসে ভাসে হাহাকার..|
আমি নাগরাজ কৌরভ্যনাগের কন্যা উলুপী..
আজও সন্তান হারানোর বেদনায় কাঁদি নিজেকে কোপী ,
কিন্তু কুন্তীপুত্র অর্জুন তোমায় অকৃপন ভালোবেসে ছিলাম ;
ধর্মানুযায়ী যুদ্ধ ক্ষেত্রে ইরাবানকে যেতে অনুমতি দিয়েছিলাম,
তাই সম্পূর্ণ একাই রয়ে গেলাম..|
প্রণয় ও অভিমান
শোন লো শ্রীমতি রাধারাণী..
শুনে , ওই বংশীধ্বনি-হোস না পাগলিনী ,
যাসনে রে , সেথায় একাকিনি ;
ঘরে আছে ননদিনী , সে কটুভাষিণী ,
পারবি কী সইতে -ওরে মৃদুভাষিণী ?
এলো যে ঘনিয়ে নিশীথিনী..
বয়ে চলে কল্লোলিনী,সেযে সদা আমোদিনী,
শোন সরীসৃপের সরসরানী ;
উলূকের ওই কর্কশ তীক্ষ্নধ্বনি ,
জংলী হায়নার হিংস্র হাহাধ্বনি |
ওরে কানু বাজাসনে বেনু..
রাধারানী প্রেমে স্থানু,হলো যে মগ্ন মজনু,
সরসী বিম্বে দেখে তব অতনু ;
ক্রমাগত কৃশ হচ্ছে এ গৌর সুতনু ,
মোহ মুক্ত কর বলি করে নতজানু |
মিলন আশে নিচ্ছে যতন..
ফনী করে সম্মোহণ , বেচে হাতের কঙ্কন ,
ভূমি করে পিছল ইচ্ছামতন ;
পদতল ঐ কন্টকে করে আঘাতন ,
নিরব চলার কামনায় সচেতন |
অভিশারে চললো মোহিনী..
উৎসর্গের ইচ্ছায়,হ্লাদিনী হলো লাবণী,
সঙ্কেত কুঞ্জে এলো বৃষনন্দিনী ;
দেখে কৃষ্ণ নাই হেথা হলো বিষাদিনী ,
হৃদয় করে কোপে পূর্ণ অভিমানিনী |
শক্তির ক্রোধে ফুল শুকায়..
সমগ্র বৃন্দাবনেই , হাহাকার মেচে যায় ,
শুনে কানাই বরসনায় ধায় ;
ফুল দিয়ে মানিনীর মান যে ভাঙ্গায় ,
চারো দিশা গায় গীত একলহমায় |
বিনা প্রেমে জীবন বিবর্ণ...
প্রণয় অভিমান , পরস্পরেই পরিপূর্ণ ,
বিশ্বাস, সম্মান, দায়িত্বই গণ্য ;
ঊশ্রী বলে চাই হতে ঐ শুদ্ধ অমৃতে পূর্ণ,
শেষ ভালো যার,তার সবই ভালো অনন্য |
আমি প্রণমী
তখন ছিলো সময়টা ৫৬৩ বি.সি. পৃথিবীর..
শুদ্ধোধন ছিলেন , গোষ্ঠী প্রধান-শাক্য গোষ্ঠীর ,
পত্নী মায়াদেবী ,পদ্মফুল শ্বেতহস্তী-স্বপ্নে দেখলেন..
কোল্লীয় রাজ্যের রাজকুমারী পিতৃগৃহে চললেন ,
পথেস্থিত ,লুম্বিনীবাগানে শালবৃক্ষের তলে জন্মিলেন-তথাগত..
এরপরই ,সাতদিনের মধ্যে-মাতা হলেন গত ;
মহাপ্রজাপতি গৌতমী , পালন করেন-জননীহারা সিদ্ধার্থকে..
শাক্যমুনি , গৌতম নামে -পরিচিত হলেন এথেকে l
জাতকের মধ্যে , মহাপুরুষের লক্ষণ আছে-বললেন কুলপুরোহিত..
যুবাবস্থায় , বিবাহবন্ধনে যশোধরার সহিত হলেন- নববিবাহিত,
তাহাদেরই , সংসারধর্মে রাহুল- পুত্র রূপে জন্মায়..
সাতদিনের পরেই , গৌতম -গৃহত্যাগ করে যায় ,
জরা , ব্যাধি , মৃত্যু ,অনাসক্ত আনন্দিত সন্ন্যাসী..
দেখে সিদ্ধার্থ , করলেন গৃহত্যাগ- হলেন পথবাসী ;
শান্তির আশে , নিজ হৃদয়- করলেন উন্মোচিত..
এই ঘটনা ,বৌদ্ধধর্মে মহাভিনিষ্ক্রমণ নামেই- পরিচিত |
গৃহত্যাগের সময় , কিছুদূর যায়-ঘোড়া কন্থক..
সঙ্গে ছিলো ,প্রিয় সারথী - বন্ধু ছন্দক ,
সংসার ত্যাগের পর প্রথমেই যান বৈশালী..
সেইখানেই ছিলেন প্রথম গুরু অত্যন্ত জ্ঞানশালী ,
দর্শনের অন্যতম সাধক সাংখ্য আলারা কালাম..
শিক্ষা গ্রহণেও মনখিদে মেটাতে হলেন নাকাম ;
এরপর গুরুরূপে নির্বাচন করলেন রুদ্রক রামপুত্রকে..
পঞ্চভিক্ষুর সাথে ধ্যানে বসলেন উস্কাতে উপলব্ধিকে l
ঘুরতে ঘুরতে গয়ার কাছে উরুবিল্বগ্রামে আসেন..
বোধগয়া নামে পরিচিত -সেখানে ধ্যানে বসেন ,
স্থানীয়মেয়ে , সুজাতার দেওয়া-একবাটি পায়েস খান..
নৈরঞ্জনা নদীর তীরে অশ্বত্থতলে ধ্যানেতে বসেন ,
এরপরেই তিনি বোধিত্ব লাভে হন অববুদ্ধ..
সেই অশ্বত্থ বৃক্ষ বোধিবৃক্ষ নামে প্রসিদ্ধ ;
বুদ্ধত্ব অর্জনে নাম হয় বুদ্ধ ,তথাগত..
বুদ্ধ শব্দের অর্থ , যে জ্ঞানপূর্ণ শাশ্বত |
জ্ঞানকে প্রসার এবং মানুষের দুঃখ নিবারণে..
তথাগত করলেন যাত্রা ধর্ম ও জ্ঞানবিতরণে ,
সারনাথের মৃগদাব বাগানে প্রথম করেন ব্যাখ্যাত.. পঞ্চভিক্ষুর নিকটে ,তাহাই - ধর্মচক্রপ্রবর্তন নামে খ্যাত ;
বুদ্ধদেব ,শিষ্যদের জন্য -সংঘ প্রতিষ্ঠা করলেন..
সমবায় ও একতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য সম্মুখে রাখলেন ,
দূর করেন , জাতিভেদজনিত ,সকল সংকীর্ণ মানসিকতাকে...
মুক্তির পথ দেখালেন ধর্মের জটিলতা থেকে ।
কণিষ্ক বৌদ্ধধর্ম ভারতে ও বহিরবিশ্বে ছড়ান..
সম্রাট অশোকও একই পন্থা গুলি আওড়ান ,
তৎকালীন ভারতবর্ষে বুদ্ধদেবের ধর্মমতে হয়েছিল একত্রিত..
সকলশ্রেণীই , সহজ সরল ধর্মজে হয়েছিল সন্মত ,
জীবিতকালে তাহার উপদেশাবলী ধর্মনীতি হয়নি লিখিত..
মুখেমুখে জনগণের সহজবোধ্য ভাষায় হতো ঘোষিত ;
তিনি কখনই করেননি বঞ্চিত জ্ঞান হতে..
প্রানভরে সেইসব দান করে গেছেন অনন্যচিত্তে |
গৌতমবুদ্ধ ৪৮৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে আশি বছর বয়সে..
দেহত্যাগ করেন গোরক্ষপুরের কুশীনগরে শেষ নিঃশ্বাসে ,
মহাপরিনির্বাণের পরে তার বাণী করতে সংকলন.. রাজগৃহে প্রথম বৌদ্ধ সম্মেলনের হয় আহ্বান ,
এস্থানে সপ্তপর্ণী পর্বত গুহায় অনুষ্ঠিত এ'সংগীতি.. মহাত্মার উপদেশাবলী দুখন্ডে সংকলিতরূপে হচ্ছে প্রতীতি ;
বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি,ধম্মং শরণং গচ্ছামি..
সংঘং শরণং গচ্ছামি , এ'বানীরে আমি প্রণমি |
No comments:
Post a Comment