মনের কোণে ধুলো --
কবিরুল (রঞ্জিত মল্লিক )
ডিউটি শেষ করে মেজর জেনারেল যোগিন্দর সিং যখন আর্মির বেস ক্যাম্পে এসে পৌঁছল তখনই সিনিয়র অফিসার তাকে ফোনটা করেন। একটা টুরিস্ট বাসকে জঙ্গীরা আটক করে রেখেছে। সেই বাসে ষাট জন যাত্রী জঙ্গীদের কবলে পড়ে নিদারুণ বিপদের সন্মুখীন। তাদের মধ্যে এক বিবাহিত মহিলা জঙ্গীদের চোখে ধুলো দিয়ে বাস থেকে নেমে পালিয়ে যায়। কিন্তু কিছুদূর যাবার পর মেয়েটা পথ হারিয়ে যায়।
জঙ্গীদের কবল থেকে ঐ টুরিস্ট বাসটিকে উদ্ধারের দায়িত্ব যোগিন্দর সিং কে দেওয়া হয়। সেই সাথে ঐ মেয়েটিকেও উদ্ধার করতে হবে। যোগিন্দরকে একটু টেন্সড্ দেখাল। এক কাপ কফি খেয়েই ও নিজের গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সিনিয়র অফিসারের সাথে দেখা করতে।
সিনিয়র অফিসারের সাথে আলোচনা করে নিজের দায়িত্বটা বুঝে নিল। তারপর বেরিয়ে পড়ল অপারেশনের উদ্দেশ্যে। আজ যোগির কাছে এটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। জঙ্গীদের কবল থেকে বিপন্ন যাত্রীদের ওকে উদ্ধার করতেই হবে।
নিজের মোবাইলে জিপিএস টা অন করেই অপারেশনের একটা সুন্দর ছক কষে ফেলল। তারপর অনেক সার্চ করার পর লোকেশন ট্রেস করে জঙ্গী সমেত জঙ্গী কবলিত বাসটা খুঁজে বার করল। নিজের জীবন বিপন্ন করে জঙ্গীদের সাথে দারুণ লড়াই করে যাত্রীদের উদ্ধার করল। দু একজন জঙ্গী মারাও গেল। তবে পালিয়ে যাওয়া সেই মহিলার এখনও কোন খোঁজ পাইনি। ওকেই এখন খুঁজে বার করতে হবে।
যোগি একটা জিনিস বুঝতে পেরেছে মেয়েটা কাছাকাছি কোথাও না কোথাও আছে। বেশ কিছুটা পথ যাবার পর জঙ্গলের পাশ দিয়ে একটা রেল লাইন চলে গেছে। রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা মহিলাদের ছোট পার্স পাওয়া গেল। তাতেই যোগি সিউর হল যে মহিলা এই দিক দিয়ে গেছে। মহিলার পার্সটা খুলতেই কেমন চমকে উঠল। ভিতরে একটা ছবি। ছবিটা তার খুব চেনা। তার বহুদিনের পরিচিত মানালীর ছবি। মানালীর সাথে অনেক দিন হল কোন দেখা নেই। জানেনা ও কেমন আছে। তবে এভাবে মানালীর স্মৃতি ফিরে আসবে ও ভাবতেই পারেনি। চোখটা ছলছল করে উঠল।
যোগিন্দরের সাথে মানালির এক বিয়ে বাড়িতে আলাপ। তারপর আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বারে। পরে সেই ঘনিষ্ঠতা প্রেম অবধি পৌঁছায়। যোগিন্দর বারো ক্লাস পাশ করার পর আর্মির চাকরির জন্য পরীক্ষা দেয়। যোগির পরিবার ভীষণ অভাবী। ওর একটা চাকরি হলে পরিবারটা বেঁচে যায়। যোগি একটা যব পাবার জন্য তাই ভীষণ চেষ্টা করছে।
মানালির পরিবার বেশ উচ্চবিত্ত। ওর আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন। ও চাই যোগি অনেক অনেক বড় পদে চাকরি করূক। বড়লোকের মেয়ে বলে মানার একটু ঠাট বাঁট ও আছে। সময়ে অসময়ে ও যোগিকে হেয় করতেও ছাড়েনা।
একবার মানার জন্মদিনে ওর বাবা একটা বিশাল বড় পার্টি দেয়। বেশ গন্য মান্য আর প্রভাবশালী ব্যক্তি এই অনুষ্ঠানে আসে। যোগিও আসে। তবে যোগি একটা অতি সাধারণ মানের গিফ্ট দেয়। তাতে মানার মনে খুব লাগে। মানা ভেবেছিল যোগি অন্যদের মত দামী গিফ্ট দেবে। যোগিরও এতে অভিমান হয় একটু। তবু ও মানাকে ভালবাসে। তাই মুখে কিছু বলেনা।
এরপর আস্তে আস্তে মানা আর যোগির রিলেশন তলানিতে এসে ঠেকে। মানার জীবনে আদিত্য এসে হাজির হয়। ও বিশাল বড়লোকের ছেলে। পরে যোগি আর্মিতে একটা ভাল চাকরি পাই। যোগির আর্মিতে যোগদান মানা মেনে নিতে পারেনা। মানা আস্তে আস্তে যোগিকে ভুলে যায়। কিন্তু যোগি মানাকে আগের মতই ভালবাসে।
পরে মানার সাথে আদির ছাড়াছড়ি হলে মানা অন্য একটা শিল্পপতির সুযোগ্য ছেলেকে বিয়ে করে। স্বার্থপর মানা যোগিকে বিয়েতে ইনভাইট পর্যন্ত করেনি।
এরপর অনেক বছর কেটে গেছে।
..... ...... ....... .........
আজ ছবিটা দেখে মানালীর জন্য মনটা ছটফট করে ঊঠল। ও জানে মানালী এখানে কোথাও লুকিয়ে আছে। জঙ্গীদের ভয়ে বেরোতে সাহস পাচ্ছেনা। অন্ধকার আরো সবল হচ্ছে। যোগি রেললাইনের দুই ধারে খূব খোঁজাখুঁজি করল। তারপর বেশ অনেকটা পথ পেরোবার পর একটা পোড়ো মন্দির দেখতে পায়। ওখানেই ও ওর আদরের মানাকে দেখতে পাই। লুকিয়ে ছিল।
মানা যোগিন্দরকে অন্ধকারে চিনতে পারেনি। তারণর একটু আলোর রেখা দেখতেই যোগিকে চিনতে পারে। মানা নিজের ভুলটা বুঝতে পারে। ও যোগির কাছে ফিরতে চাই। আদির সাথে মানার রিলেশনটা সুখের হয়নি। কারণ মানার বাসনা অসীম। পরে শিল্পপতির ছেলেও মানার অভিসন্ধি বুঝতে পারে। যদিও সে মানাকে বিয়ে করে দু বছর পরে ডিভোর্স দিয়ে চলে যায়।মানালী এখন ভীষণ একা।অনেকদিন পরে যোগিকে সামনে পেয়ে নিজের মনের কথা গুলো বলে নিজেকে হালকা করল।
গল্প করতে করতে কখন যে সময়টা কেটে গেছে ওরা জানতেই পারেনি। মানার লাগেজটা হাতে ধরে নিজের গাড়ি অবধি এগিয়ে নিয়ে গেল যোগিন্দর। সীট বেল্টটা শক্ত করে বেঁধে নিল।আদরের মানাকে জঙ্গীর কবল থেকে মুক্ত করে পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে চলল নিজের আর্মির কোয়ার্টারে।
যোগির সাজানো ঘর গুলো দেখে মানার ঈর্ষার পারদ অনেকটাই বেড়ে গেল। ও ভাবতেই পারেনি গ্রামের ছেলে নিন্মবিত্ত যোগিন্দর এতটাই বদলে ফেলবে নিজেকে। মানালী বুঝতে পেরেছে যে সে হেরে গেছে। রাতের ডিনারেও যোগি মানার আর্থিক মর্যাদার সাথে সঙ্গতি রেখে খাবারে চমক এনেছে। যোগিকে হেয় করা যে তার উচিৎ হয়নি সেটা মানা বুঝতে পেরেছে।
রাতের ঘুমটা খুব ভালই হয়েছে মানালীর। ঘুম ভাঙ্গতেই দেখে যোগির ঘরের সামনে সোনা রোদের ঝরণা ঝলমল করছে।
ড্রেসিং টেবিলের কাছে দাড়াতেই চোখে পড়ল একটা কার্ড। কার্ডে জ্বল জ্বল করছে -
" Happy Birth Day
My dear Manaly "
মানালি ভুলেই গিয়েছিল যে আজ তার জন্মদিন। শত বিপদ , ঝুঁকি আর কাজের মধ্যে থেকেও যোগিন্দর তার জীবন শুধু বাঁচায় নি তাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে এনে ছিল তার নিজের আলো ঝলমল বাসায়। তার জন্মদিন পালন করে তাকে ধন্য করে ছিল। যোগিন্দর আজ বিশাল বড় আর্মি অফিসার। ওর আজ অনেক নাম ডাক।
দুপুরের একটু আগেই সাইরার ফোনটা বেজে উঠেছিল। দুমাস পরেই ওর আর সাইরার শাদি। যোগিন্দর নিজের গাড়িতে উঠেই গাড়ি স্টার্ট দিল। একরাশ ধুলো উড়িয়ে গাড়িটা সোজা ছুটে গেল শপিং মলের দিকে।
পিছনে পড়ে থাকল জমাট ধুলোর মেঘ আর মানালীর নীরব কান্না।
মানালীর মনের কোণে জমে থাকা দীর্ঘ দিনের ধুলো একটু একটু করে ঐ জমাট ধুলোর মেঘের কলেবর বৃদ্ধি করল।
No comments:
Post a Comment