নষ্ট বসন্ত
তাপসকিরণ রায়
সখী ভাবনা কাহারে বলে...সখী যাতনা কাহারে বলে...তোমরা যে বল দিবস-রজনী ‘ভালবাসা’,‘ভালবাসা’...কখনো কি মনে হয় ভালবাসা এক ধরনের মনের রোগ ?
বরেন আর দশটা ছেলের মত সাধারণ একটি ছেলে। যৌবনে পা ছুঁয়েছে সে। রঙ্গিন তার চোখ। সুন্দরের মাঝে আলাদা ভাবে কিছু খুঁজে নেবার নেই--কালোর মাঝে সুন্দর খুঁজে নিতে হয়। বয়সের রং পারে তাকে দেখে নিতে !
বরেনের এমনি একটা মেয়েকে ভালো লাগত। দেখতে খুব কালো, কিন্তু তার মুখশ্রী বড় সুন্দর ! চোখ দুটি নাকি তাকে সবচে বেশী আকর্ষণ করে। ওই স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান ভুলেছে বরেন। মেয়েটি তার মার সঙ্গে মাঝে মাঝে আসে। ওরা বর্তন বিক্রি করে। অনেক সময় পুরনো কাপড় চোপড় বদলে বাসন দিয়ে যায়। মাসে একবার ওদের আনাগোনা থাকেই। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ডাক দিয়ে ওঠে, বর্তন লিবে, বর্তন ? পুরানা কাপড়া দিবে আর বর্তন লিবে !
ওরা অবাঙ্গালী, টুটাফুটা বাংলা বলতে পারে। আসলে ওরা রাজস্থানি--কোথাও অস্থায়ী ডেরা পেতে কয়েক মাস থাকে, কিছু রোজগারপাতি করে চলে যায়। ওই বর্তনবালীর মেয়েটার সঙ্গে দু বছর আগে দেখা বরেনের। কত বয়স হবে--বারো কি তের। ছিমছাম চেহারা--কালোর মাঝে বেশ তূলি আঁকা শরীর যেন। ক্ষুরধার চেহারা যাকে বলে। জ্বলজ্বল উজ্জ্বল দুটি চোখ, অন্তত বরেনের মনে হয়েছে, পৃথিবীর সমস্ত মায়া যেন ওই চোখ ধরে আছে !
--কি নাম তোমার ? একদিন আড়ালে মেয়েটিকে পেয়ে বরেন জিজ্ঞেস করেছিল।
হেসে ছিল মেয়েটি--মায়াময় হাসি। একটু সময় নিয়ে উত্তর দিয়েছিল, ঝিনুক--
বাহ, ঝিনুক, এত সুন্দর নাম হয় কারো ! বরেন যেন টালমাটাল।
অপেক্ষার পর যখনই দেখা হয় এমনি ধরনের একটা দুটো কথা হয়। ঝিনুক ধীরে ধীরে বেশ বড় হয়ে গেছে। ওর মধ্যে লজ্জা লজ্জা ভাব জমে গেছে পুরোদমে। বরেন আলতো পায়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। ঝিনুক জানে বরেন ওর জন্যেই বেরিয়ে এসেছে। দুজনের মুখেই হাসির ছোঁয়া লেগে যায়। কি কথা বলবে বরেন যেন খুঁজেই পায় না !
বরেনের সাথে প্রায় প্রতিমাসে দেখা হয় ঝিনুকের। এমনি প্রায় দুটো বছর কেটে গেছে--ওরা দস্তুর মত প্রেমিক-প্রেমিকা বনে গেছে। বরেন জানে, কোথায় থাকে ঝিনুক। শহরের শেষ প্রান্তে ওদের ডেরা। ছেঁড়া জোড়াতালি দেওয়া তাঁবুর নিচে ওদের বাস। প্রায় দিন ঝিনুক চলে আসে সেই নিরালায়--যেখানে বরেন তাকে আসতে বলে। সেই ছোট নদীটির পারে--যেখানে ঝোপ, ঝাড়, জঙ্গলের আড়াল রয়েছে।
--ভালোবাসি ঝিনুক তোকে--
--হামি ভী ভালোবাসি টুকে--প্যায়ার করি--কিন্তুক তুই তো হামারে বিয়া করবি না, জানি--
কেন ?
--হামার মা বাতিয়েছে--তুদের সাথ মোদের বিয়া হবার লয়--
--কেন রে ! প্রেমের বিপাকে পড়ে বরেন অন্ধ--তার সত্তা হারিয়েছে। বয়সের সমস্ত রং ফেলে তার চোখে জমে আছে কালো, অন্ধত্বের রং !
আমি তোকে বিয়ে করবো--আমি তোকে ছাড়া বাঁচব না রে ঝিনুক ! ঝিনুকের হাত বরেনের হাতে, ঝিনুকের মুখ বরেনের মুখের একেবারে ছুঁইছুঁই পাশটিতে, উভয়ের বাষ্পায়িত শ্বাস উভয়ের মুখমন্ডলে স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছে--ওরা চুপচাপ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে--নিষ্পলক।
ঝিনুকের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসছে, মা বইলেছে,তুদের সঙ্গে হামাদের বিয়া হোয় না রে--
হয়, হয়, হয়, বরেন প্রেমাবেশে জড়িয়ে ধরে ঝিনুককে।
ঝিনুকের মা একদিন বাধা দেয় বরেনকে, সাবধান করে দেয়, আমার লেড়কীর দিকে তু হাত বাড়াবি না বাতিয়ে দিলাম !
বরেন কিছুতেই শুনতে চায় না--ঝিনুকের মা বলে, হামাদের অন্দর ভালবাসা বইলে কিছু নাই--তুর যুদি ঝিনুকের সঙ্গে এত প্যায়ার তবে তুকে হামি বাতাই দিই, হাজার টাকা হাতে লিয়ে তবে হামাদের ডেরায় আসবি--
সেদিন বরেন বাবার রাখা মায়নার টাকা থেকে এক হাজার টাকা সরিয়ে নিলো। আর ভর দুপুরে গিয়ে হাজির হল ঝিনুকদের ডেরায়। ঝিনুক আর তার মা ঘরে ছিল। বরেনকে দেখেই ঝিনুকের মা বলে উঠলো, কি খবর ?
চাপা স্বরে বরেন বলে ওঠে, টাকা এনেছি।
এনেছিস ? দে দেখি—
বরেন হাজার টাকা ঝিনুকের মার হাতে তুলে দেয়।
ঝিনুকের মা ঝিনুকের দিকে তাকায়, ঝিনুক চাপা স্বরে কেঁদে উঠে, না লা লা...
--ঝিনুকের মা ঝিনুকের দিকে লাল চোখ নিয়ে বলে উঠলো, যা বাতিয়েছি তাই করবি--মনে থাকে যেন—তারপর বরেনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, তুদের একলা ডেরাতে ছেইড়ে দিলাম...হামি এক ঘণ্টা বাদে আসব...তরা যত পারিস প্যায়ার-ভালবাসা কইরে নে--
ঝিনুক কাঁদছে--হামাদের কুনো প্যায়ার নাই--নেও তুমি হাজার টাকা দিইয়েছ--হামার শরীল তুমাকে দিলাম--তুমি আমারে আদর করো...জড়াইয়া ধরো...আমারে ভালোবাসো...
বরেনের মুখ থেকে কোন কথা সরল না--সে ঝিনুকের মুখোমুখি হয়ে নিশ্চল ভাবে দাঁড়িয়ে থাকল।
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment