Wednesday, 12 October 2022

স্মৃতিশেখর মিত্রের গল্প ও কবিতা --

স্মৃতি শেখর মিত্রের গল্প ও কবিতা -- 
গল্প --

প্রেম

গয়া জেলার চৌপারনে ছত্তীশ যাদবের বাস।
অত্যন্ত পরিশ্রমী ও সৎ মানুষ। গোয়ালা হিসাবে
তার সুনাম রয়েছে ঐ তল্লাটে। গোয়ালাদের
স্বভাবের কোন কিছুই ওর মধ্যে দেখা যায় না।
অন্যান্য গোয়ালাদের ধারণা দুধে জল মেলানো
তাদের জাতির ধর্মের মধ্যেই পড়ে।ঈশ্বরও
সেকথা মেনে নিয়েছেন। যেমন স্যাকরাদের 
কাজ সোনায় খাদ মেশানো নইলে গয়না বানানো যায় না। সেই ছত্তীশ যাদবের বুড়ি
গাইটি শেষ বয়সে একটি এঁড়ে বাছুরের জন্ম
দেয় এবং ছত্তীশ যাদবের শত চেষ্টাতেও
গাইটিকে বাঁচানো সম্ভব হলো না।কন্যা সন্তানের
মতো সে তার বুড়ি গাইটিকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে। শীতের সময় থাকায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় তার তৈরী করা বড় বস্তার ঢাকা বাছুরের ও তার মায়ের শরীরে ঢাকা দিয়ে দেয় যাতে
তাদের ঠান্ডা না লাগে। সারা শরীর ঢেকে দিত
তাছাড়াও ঘুঁটে জ্বালিয়ে গাইটির শরীরে যাতে
গরম ধরে তার চেষ্টা করে। কিন্তু কোন প্রয়াসই তার কাজে এলো না। শেষ বয়সে বাচ্চা বিয়ানোর ধকল সহ্য করতে না পেরে তার মৃত্যু ঘটে।তার মৃত্যুতে ছত্তীশ যাদব কন্যা হারানোর
বেদনা অনুভব করলো।এ সংসারে ছত্তীশের
নিকট আত্মীয় বলতে কেউ নেই। একটি বোন
ছিল তারও বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর একেবারে
একা হয়ে যায়।
বুড়ি গাইটি মারা যাওয়ার পর তার উপর সমস্ত
দায়িত্ব এসে পড়ে সদ্যজাত বাছুরটির। সারাদিন
বাছুরটি হাম্বা হাম্বা স্বরে ডেকে ডেকে মাকে খুঁজে বেড়ায়। ছত্তীশের নরম মনে গভীর বেদনার
সঞ্চার হয়।বাছুরটিকে কীভাবে বড় করা যায় সেই চিন্তায় সে ডুবে থাকে সারাদিন।নেহাৎ বাছুর মায়ের দুধ ছাড়া বাঁচে কেমনে!
তবু সে প্রতিদিন বাছুরটির খাওয়ানোর জন্য
এক পোয়া করে দুধের বন্দোবস্ত করে।গাইটির
বিয়ানোর পর তার আশা ছিল গাইটি থেকে
দোহানোর পর যে দুধ পাওয়া যাবে তাতে তার
নিজের খাওয়া দাওয়ার কিছুটা হলেও সুরাহা হবে কিন্তু হায় এখন তাকে অন্যদের কাছ থেকে
বাছুরকে খাওয়ানোর জন্য দুধের জোগাড় করতে হচ্ছে। ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছত্তীশের মন
যদিও কাতর হয় কখনো কেমনে তবু তার
ঈশ্বরের উপর আস্থা আবার বেড়ে যায়। ভাতের
ফেনা ও তার সঙ্গে ভুসি মিশিয়ে বাছুরের মুখের
সামনে ধরে।বাছুরটির খাওয়ার খুব কষ্ট হয়। কিন্তু
ধীরে ধীরে খেতে শিখে যায়। এভাবেই কোনমতে বাছুরটি বেঁচে যায়। ছত্তীশের মনের গভীর
আশঙ্কা দূর হয়।মুক্তি পায় তার নিত্যদিনের গভীর চিন্তা থেকে। এদিকে মাতৃহারা বাছুরটির
উপর তার স্নেহ ও ভালবাসা গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে তার অবলম্বন বলতে এ
বিশ্ব সংসারে ঐ বাছুরটি।তাই সে বাছুরটিকে
অতিশয় যত্ন সহকারে বড় করে তোলার চেষ্টা করে। প্রতিদিন পুকুরের জলে স্নান করায়।ওর
জন্য মাঠ থেকে কচি কচি ঘাস কেটে বোঝা
বেঁধে নিয়ে আসে। বাছুরটির পেছনে সময়
দিতে দিতে কখন যে তার দিন পার হয়ে যায়
সে বুঝতেও পারে না। রাতের বেলা কোন
রকমে নিজের জন্য চার পাঁচটি চাপাটি ও
সারাবছর খাওয়ার জন্য বানানো আমের আচার
ও কাটা পেঁয়াজ সহযোগে রাতের খাবার খেয়ে
আটটার মধ্যে শুয়ে পড়ে। শোওয়ার আগেও
একবার বাছুরটিকে দেখে আসে।এ ভাবেই
তার দিন কাটে এবং বাছুরটিও মোটামুটি
বড় হয়ে যায়।অবসর সময়ে যখনই বাছুরটির
সারা শরীরে হাত বোলায়।সে তার আদর
বুঝতে পারে এবং মাঝে মাঝে ছত্তীশের গায়ে
মুখে জিভ দিয়ে চাটতে থাকে। কখন যে
দুজনার মধ্যে গভীর স্নেহ ও ভালবাসার সম্পর্ক
গড়ে ওঠে বোঝাও যায় না। ছত্তীশের বয়স যখন সত্তর বছর পার হয়ে যায় তখন অনিয়মিত
খাদ্যাভ্যাসে অসময়ে বার্ধক্যের দোর গোড়ায়
পৌঁছে যায়।সে বুঝতে পারে আমার কাছে থাকলে বাছুরটি সময় মতো খেতে পাবে না।কে
তার দেখাশোনা করবে?তাই সে মনস্থির করে যে
অল্প মূল্যের বিনিময়ে ওকে পাশের গ্ৰামের এক
গোয়ালাকে বিক্রি করে দেবে কারণ তার ভগ্ন
স্বাস্থ্যের কারণে কবে যে তার মৃত্যু হবে তার ,সে
নিজেও জানে না।তাই তার ভালো চিন্তা করে
পাশের গ্ৰামের রামযতন গোয়ালার নিকট খুব
অল্প মূল্যের বিনিময়ে বেচে দেয় এবং ফিরে
আসার সময় বার বার অনুরোধ করে আসে
সে যেন বাছুরটিকে ভালভাবে রাখে। বাছুরটি
কিছুতেই অন্য গ্ৰামে যেতে চায় না।ও বুঝতে
পারে ওকে অন্য কোথাও রাখা হবে।যতবার
পৌঁছে দিয়ে আসে ততবারই কোন না কোন
ভাবে ছুটে চলে আসে ছত্তীশের কাছে। এভাবেই
কিছুদিন কেটে যায়। অতঃপর একদিন মাঝরাতে ছত্তীশের প্রচন্ড মাথা ব্যথা ও বমি শুরু হয় সঙ্গে জ্বর।
সবাই জানালো ওর ডেঙ্গুজ্বর হয়েছে। বাছুরটি
পরদিন ভোরেই ছত্তীশের ঘরে ঢুকে যায় যেখানে সে শুয়ে ছিল। তার বিছানার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে।অবলা বেজুবান প্রাণী কিছু বলতে না পারলেও বুঝতে পারে তার মালিকের
কিছু হয়েছে। শুধু হাম্বা হাম্বা করতে থাকে এবং
তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে আসে।সে প্রচন্ড
ছটফট করতে থাকে।ইত্যবসরে তার নতুন
মালিক এসে তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। সারা
রাস্তা সে হাম্বা হাম্বা রবে কাঁদতে কাঁদতে রামযতনের বাড়ি পৌঁছায়। রামযতন তাকে
বিচালী কেটে দেয় কিন্তু সে কিছুতেই খায় না।
এভাবে রাতভর মাঝে মাঝেই হাম্বা হাম্বা রবে
তার গভীর কষ্টের কথা জানান দেয়। একটি
অবলা প্রাণীর প্রেম যে মানুষের আপন সন্তানের
থেকে কখনও কখনও অনেক বেশি হতে পারে তা বেশ বোঝা যায়।
পরদিন সকালে সে ছাড়া পাবার সঙ্গে সঙ্গে
সিধা ছত্তীশের বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়।এসে
দেখে যে ছত্তীশের কোন নড়ন চড়ন নাই।
সে বুঝতে পারে তার মালিকের ভীষণ কিছু একটা হয়েছে। আশেপাশের প্রতিটি ঘরে হাম্বা হাম্বা রবে যায় আবার ছত্তীশের খাটের সামনে এসে দাঁড়ায়।ওর অস্থিরতা দেখে পাড়া প্রতিবেশীরা সবাই বুঝতে পারে হয়তো ছত্তীশের 
কোন বড়রকম কিছু বিপদ হয়েছে যার জন্য
তার বাছুরের চোখে এতো ধারা বইছে এবং সে
উন্মাদের মতো হাম্বা হাম্বা রবে ডাক ছাড়ছে।
ওরা সকলে এসে দেখে ছত্তীশের হাত পা সব
বরফের মতো ঠান্ডা ও কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেছে। ওরা অনুমান করে যে সে হয়তো মাঝ
রাত্রে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।ওর তিন
কূলে কেউ না থাকায় গ্ৰামবাসীরা নিজেদের
মধ্যে আলাপ আলোচনা ক'রে তার দাহ সৎকারের জন্য তৈরী হতে থাকে তখন বাছুরটি
ছত্তীশের খাটের সামনে দাঁড়িয়ে স্থির দৃষ্টিতে
ছত্তীশের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কখনও
বা হাম্বা হাম্বা রবে ডেকে ওকে ওঠানোর চেষ্টা
করে। মুখের কাছে মুখ নিয়ে যেয়ে জিভ দিয়ে
মুখে জিভ ঠেকিয়ে উঠাতে চায়।যেন বলতে চায়
" তোমার কী হয়েছে, তুমি এখনও শুয়ে আছো
কেন? এবার তো ওঠো।"কিন্তু কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে ওর মালিকের খাটের পাশে বসে পড়ে।
দুটি বাঁশ দিয়ে যখন মড়াটিকে বেঁধে শশ্মানে
নিয়ে যাওয়া হয় তখন সে  সমগ্ৰ গ্ৰামবাসীর
পেছন পেছন শশ্মানে এসে উপস্থিত হয়। একটা
গভীর অস্থিরতা তার মধ্যে ক্রিয়াশীল সেটা
গ্ৰামবাসীরা বেশ উপলব্ধি করে। ছত্তীশের মুখের 
ঢাকা দেওয়া কাপড় বার বার উঠিয়ে ফেলে দিতে চায়।যেন বলতে চায় "তুমি আমাকে ফেলে
কোথায় যেতে চাও? অনেক হয়েছে এবার তো
ওঠো।"আবার পরক্ষণেই খাটের পাশটিতে বসে
বার বার হাম্বা হাম্বা রবে ডাক ছাড়তে থাকে। এবং যতক্ষণ না শব দেহটিকে অগ্নিকুন্ডের
মধ্যে শোয়ানো হয় ততক্ষণ সে ঠায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।মূক প্রাণী মানুষের
মতো ডাক ছেড়ে কাঁদতে পারে না কিন্তু এ
যেন এক গভীর শোকের ছায়া তাকে দেখেই বোঝা যায়।তার হাম্বা রবে এবং চোখের
সকরুণ দৃষ্টি শশ্মান যাত্রীদের মধ্যেও গভীর
কষ্টের আবহ তৈরি করে দেয়। ছত্তীশের মৃতদেহ
সম্পূর্ণরূপে দাহ না হওয়া পর্যন্ত সে একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। তার নীরব চোখের জল
সমস্ত শশ্মান যাত্রীদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়
সকলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।সমস্ত পরিবেশ
কান্নায় হাহাকার করে ওঠে।গ্ৰামের শশ্মান
ফল্গু নদীর তীরে হওয়ায় ফল্গু নদীও এই
দৃশ্যের সাক্ষী থেকে যায়। 

কবিতা--

কুস্তি খেলার বন্ধু--

এখন অনেক রাত
বসে আছি প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে
আমার পাশে এসে বসলেন
এক দীর্ঘকায় সুপুরুষ ।
লম্বা কোঁকড়ানো চুল ,সুন্দর
একমুখ কালো কালো দাড়ি ।

আমি বিস্ময়ে হতবাক
আমার পাশে এসে বসেছেন
ইনি তো স্বয়ং" রবীন্দ্রনাথ "!
তিনি বললেন " বৎস! তুমি এসো
আমার সঙ্গে তোমার শেষ ট্রেন
আসার এখনও অনেকটাই দেরি আছে।
এসব জায়গায় তুমি আসোনি তো আগে
চলো তোমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি
প্ল্যাটফর্মের বাইরে কোথায় কী দেখার মতো আছে।"
তিনি তাঁর শক্ত মুঠোয় ধরলেন আমার হাত।
বললেন, " এ জায়গার কথা কী তোমার স্মরণে
আসে? আমি আর তুমি রোজ বিকেলে এসে
কতদিন কুস্তির মহড়া দিয়েছি; তুমি প্যাংলা হলে
কী হবে তোমার শরীরেও ছিল ভালোই তাগদ।
যদিও আমারই জিৎ হতো বরাবর"।
আমি বললাম, "তুমি কবে কুস্তির মহড়াতে ভাগ
নিয়েছো ! তবে তুমি এতো এতো গান ও কবিতা
লিখলে কেমনে?"আমার প্রশ্ন শুনে তিনি মৃদু হাসি হাসলেন।  "সেসব গুঢ় রহস্যের কথা নাই বা শুনলে। তবে একথা জেনে রাখো, যতদিন
বেঁচে আছি তোমাকে আমার মনে থাকবে কুস্তি
খেলার পার্টনার হিসেবে।"
আমার শেষ ট্রেন আসতে দেখে তিনি জানালেন,
"এসো! তোমাকে ট্রেনে চড়িয়ে দিই। আমার
কথা তুমি অবশ্যই মনে রেখো, কবি হিসেবে নয়
শুধু কুস্তি খেলার বন্ধু হিসেবে।"
তিনি বললেন, "বিদায় বন্ধু বিদায়! এবার
তোমার সঙ্গে দেখা হবে সরাসরি কুস্তির আখড়ায়।"

Sunday, 9 October 2022

সম্পাদকীয়--


সম্পাদকীয়--


প্রকৃতির মাঝে আমরা সব কিছু খুঁজে পেতে পারি--আনন্দ সুখ দুঃখের বীজ তো তার মাঝেই লুকিয়ে থাকে।

সুখ দুঃখ হাসি কান্না এ সব কিছু জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আর আমাদের মনের মাঝেই তো এ সবের নিবাস।

প্রচন্ড দাবদাহের মাঝ থেকে যখন শীতল হাওয়ার এক ঝোঁকা গায়ে এসে লাগে আমরা যেন সুখের ছোঁয়া পেয়ে যাই। তেমনি অনেক সময় স্মৃতির পাতা থেকে আমরা দুঃখকে টেনে আনি। বস্তুত মন খালিস্থান ধরে রাখতে পারে না। সে স্থানও তার ভরাট চাই। নিদ্রার মাঝে তাই বুঝি স্বপ্ন ঢুকে যায়, সে স্বপ্ন আমাদের মনের সুখ কিংবা বেকার ছাড়া আর কিছু নয়।

পূজোর রেস এখনো চলছে, সামনে আসছে দীপাবলী উৎসব। সব উৎসবের মাঝে আমাদের ভেতরের উৎসব, মানে, মনের উৎসবটাই সবচেয়ে বড় উৎসব। আর একে মনের মাঝে উজ্জীবিত করে রাখার চেষ্টাই বড় কথা।

আসুন আমরা আপাতত কিছু করি, প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখি কিংবা বাতায়নে বসে কিছু পড়ি। মানুষের মন মানসিকতা নিজের মনের মাঝে জড়িয়ে নিয়ে অন্যের সুখ দুঃখের সহভাগী হই। আকাশের মত উদার হলে আমাদের জীবন চলে না, তাই সাঁঝের মাঝে চাঁদ আবির মাখে। না তাকে কখনো রক্তরাগ ভাববো না। আসুন আজ আমরা স্ব-বর্ণ উৎসব সংখ্যার পাতা উল্টাই--দু-একটি কবিতা গল্প পড়ি--উৎসবকে মাথায় রেখে জীবনের কিছুটা সময় না হয় পার করি। ধন্যবাদ--তাপসকিরণ রায়।

সম্পাদকীয় --

উৎসব পরবর্তী দিনগুলি এমনিতেই বড়ো বেশি বিষণ্ন করে তোলে।তাছাড়া যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেল তার জন্য সমস্ত মানুষের মনে  বিসর্জনের ঢাক।এত ছন্দপতন তবুও  থেমে থাকে না কোন কিছুই।পৃথিবী চলে তার নিজস্ব ছন্দে।যারা চলে গেল তাদের পরিজনদের প্রতি সহানুভূতি, সান্ত্বনা রইলো। শান্তি কামনা করি তাদের জন্য,অকালেই প্রাণ গেল যাদের এই দুর্ঘটনায়। দেবদূতের ভূমিকায় এসে যে কয়েকজন যুবক নিজেদের বিপন্ন করে অন্যের প্রাণ বাঁচিয়ে তোলার তাগিদ অনুভব করেছিল তা নামী দামী স্কুলে পড়ার ফসল নয়, তারা কেউই তথাকথিত সভ্যতার মুখোশ নয়।মানবিকতার উজ্জ্বল মুখ। আজকের আত্মসর্বস্ব মানুষের মাঝে  বিরল দৃষ্টান্ত রাখতে সমর্থ হলো প্রকৃত  মানুষ হিসাবে।
 আমরা অভিভাবক গণ আমাদের সন্তানদের প্রকৃত শিক্ষা দিচ্ছি না।এখন শেখাচ্ছি কিভাবে প্রতিযোগিতায় পাল্লাদিতে হয়,নামিদামি ইস্কুলে পড়াতে যাচ্ছি  তা সে ক্ষমতার বাইরে গিয়েও। সন্তানরাও আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।কেরিয়ার সর্বস্ব হয়ে অবহেলা করছে পরিবারকে সমাজকে,যে সমাজ তাকে জুগিয়েছে বাঁচার রসদ।সেই সমাজের মানুষরা আজ তার কেউ নয় যে পরিবেশে সে শ্বাস নিতে শিখেছে সেই পরিবেশের প্রতি তার দায়বদ্ধতা কে অস্বীকার করে চাইছে এগিয়ে যেতে। আমরা ভুলে যাচ্ছি সন্তানরা আগে একজন মানুষ ,সামাজিক মানুষ।তাই সে যাই হোক না কেন,প্রথম শর্ত হোক সন্তানকে একক শিশু নয়,পরিপূর্ণ সামাজিক মানুষ  করে গড়ে তোলা।আর দৃষ্টান্ত স্বরূপ উঠে আসুক সেই সব মানুষদের কথা যাদের শ্রমের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে সভ্যতার ইমারত। দিতে শিখুক শ্রমের প্রতি মর্যাদা। আদর্শ হোক সেই সব মানুষেরা ,মূল্যবোধ কথাটা যারা বাপের জন্মেও শোনেনি অথচ তারা ঠিক জানে  মানুষের প্রাণ বিপন্ন হলে কিভাবে বুক বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়,জানে অন্যের বিপদে আপদে কিভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বন্ধু হয়ে উঠতে হয়। 
এবারের ই পত্রিকাটি না হয়  সেই সব মানুষের আদর্শের কথা ভেবে তাদের প্রতি উৎসর্গ করা হোল।
 সম্পাদক মণ্ডলী সহ পত্রিকার সকল কবি ও লেখক,এবং পাঠককুল কে  জানাই ৺ বিজয়ার আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

গল্প -- নষ্ট বসন্ত -- তাপসকিরণ রায়

নষ্ট বসন্ত 

তাপসকিরণ রায় 


সখী ভাবনা কাহারে বলে...সখী যাতনা কাহারে বলে...তোমরা যে বল দিবস-রজনী ‘ভালবাসা’,‘ভালবাসা’...কখনো কি মনে হয় ভালবাসা এক ধরনের মনের রোগ ?

বরেন আর দশটা ছেলের মত সাধারণ একটি ছেলে। যৌবনে পা ছুঁয়েছে সে। রঙ্গিন তার চোখ। সুন্দরের মাঝে আলাদা ভাবে কিছু খুঁজে নেবার নেই--কালোর মাঝে সুন্দর খুঁজে নিতে হয়। বয়সের রং পারে তাকে দেখে নিতে ! 

বরেনের এমনি একটা মেয়েকে ভালো লাগত। দেখতে খুব কালো, কিন্তু তার মুখশ্রী বড় সুন্দর ! চোখ দুটি নাকি তাকে সবচে বেশী আকর্ষণ করে। ওই স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান ভুলেছে বরেন। মেয়েটি তার মার সঙ্গে মাঝে মাঝে আসে। ওরা বর্তন বিক্রি করে। অনেক সময় পুরনো কাপড় চোপড় বদলে বাসন দিয়ে যায়। মাসে একবার ওদের আনাগোনা থাকেই। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ডাক দিয়ে ওঠে, বর্তন লিবে, বর্তন ? পুরানা কাপড়া দিবে আর বর্তন লিবে !

ওরা অবাঙ্গালী, টুটাফুটা বাংলা বলতে পারে। আসলে ওরা রাজস্থানি--কোথাও অস্থায়ী ডেরা পেতে কয়েক মাস থাকে, কিছু রোজগারপাতি করে চলে যায়। ওই বর্তনবালীর মেয়েটার সঙ্গে দু বছর আগে দেখা বরেনের। কত বয়স হবে--বারো কি তের। ছিমছাম চেহারা--কালোর মাঝে বেশ তূলি আঁকা  শরীর যেন। ক্ষুরধার চেহারা যাকে বলে। জ্বলজ্বল উজ্জ্বল দুটি চোখ, অন্তত বরেনের মনে হয়েছে, পৃথিবীর সমস্ত মায়া যেন ওই চোখ ধরে আছে !

--কি নাম তোমার ? একদিন আড়ালে মেয়েটিকে পেয়ে বরেন জিজ্ঞেস করেছিল। 

হেসে ছিল মেয়েটি--মায়াময় হাসি। একটু সময় নিয়ে উত্তর দিয়েছিল, ঝিনুক--

বাহ, ঝিনুক, এত সুন্দর নাম হয় কারো ! বরেন যেন টালমাটাল। 

অপেক্ষার পর যখনই দেখা হয় এমনি ধরনের একটা দুটো কথা হয়। ঝিনুক ধীরে ধীরে বেশ বড় হয়ে গেছে। ওর মধ্যে লজ্জা লজ্জা ভাব জমে গেছে পুরোদমে। বরেন আলতো পায়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। ঝিনুক জানে বরেন ওর জন্যেই বেরিয়ে এসেছে। দুজনের মুখেই হাসির ছোঁয়া লেগে যায়। কি কথা বলবে বরেন যেন খুঁজেই পায় না !

বরেনের সাথে প্রায় প্রতিমাসে দেখা হয় ঝিনুকের। এমনি প্রায় দুটো বছর কেটে গেছে--ওরা দস্তুর মত প্রেমিক-প্রেমিকা বনে গেছে। বরেন জানে, কোথায় থাকে ঝিনুক। শহরের শেষ প্রান্তে ওদের ডেরা। ছেঁড়া জোড়াতালি দেওয়া তাঁবুর নিচে ওদের বাস। প্রায় দিন ঝিনুক চলে আসে সেই নিরালায়--যেখানে বরেন তাকে আসতে বলে। সেই ছোট নদীটির পারে--যেখানে ঝোপ, ঝাড়,  জঙ্গলের আড়াল রয়েছে। 

--ভালোবাসি ঝিনুক তোকে--

--হামি ভী ভালোবাসি টুকে--প্যায়ার করি--কিন্তুক তুই তো হামারে বিয়া করবি না, জানি--

কেন ?

--হামার মা বাতিয়েছে--তুদের সাথ মোদের বিয়া হবার লয়--

--কেন রে ! প্রেমের বিপাকে পড়ে বরেন অন্ধ--তার সত্তা হারিয়েছে। বয়সের সমস্ত রং ফেলে তার চোখে জমে আছে কালো, অন্ধত্বের রং ! 

আমি তোকে বিয়ে করবো--আমি তোকে ছাড়া বাঁচব না রে ঝিনুক ! ঝিনুকের হাত বরেনের হাতে, ঝিনুকের মুখ বরেনের মুখের একেবারে ছুঁইছুঁই পাশটিতে, উভয়ের বাষ্পায়িত শ্বাস উভয়ের মুখমন্ডলে স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছে--ওরা চুপচাপ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে--নিষ্পলক। 

ঝিনুকের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসছে, মা বইলেছে,তুদের সঙ্গে হামাদের বিয়া হোয় না রে--

হয়, হয়, হয়, বরেন প্রেমাবেশে জড়িয়ে ধরে ঝিনুককে। 

ঝিনুকের মা একদিন বাধা দেয় বরেনকে, সাবধান করে দেয়, আমার লেড়কীর দিকে তু হাত বাড়াবি না বাতিয়ে দিলাম !

বরেন কিছুতেই শুনতে চায় না--ঝিনুকের মা বলে, হামাদের অন্দর ভালবাসা বইলে কিছু নাই--তুর যুদি ঝিনুকের সঙ্গে এত প্যায়ার তবে তুকে হামি বাতাই দিই, হাজার টাকা হাতে লিয়ে তবে হামাদের ডেরায় আসবি--

সেদিন বরেন বাবার রাখা মায়নার টাকা থেকে এক হাজার টাকা সরিয়ে নিলো। আর ভর দুপুরে গিয়ে হাজির হল ঝিনুকদের ডেরায়। ঝিনুক আর তার মা ঘরে ছিল। বরেনকে দেখেই ঝিনুকের মা বলে উঠলো, কি খবর ? 

চাপা স্বরে বরেন বলে ওঠে, টাকা এনেছি। 

এনেছিস ? দে দেখি—

বরেন হাজার টাকা ঝিনুকের মার হাতে তুলে দেয়। 

ঝিনুকের মা ঝিনুকের দিকে তাকায়, ঝিনুক চাপা স্বরে কেঁদে উঠে, না লা লা...

--ঝিনুকের মা ঝিনুকের দিকে লাল চোখ নিয়ে বলে উঠলো, যা বাতিয়েছি তাই করবি--মনে থাকে যেন—তারপর বরেনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, তুদের একলা ডেরাতে ছেইড়ে দিলাম...হামি এক ঘণ্টা বাদে আসব...তরা যত পারিস প্যায়ার-ভালবাসা কইরে নে--

ঝিনুক কাঁদছে--হামাদের কুনো প্যায়ার নাই--নেও তুমি হাজার টাকা দিইয়েছ--হামার শরীল তুমাকে দিলাম--তুমি আমারে আদর করো...জড়াইয়া ধরো...আমারে ভালোবাসো...

বরেনের মুখ থেকে কোন কথা সরল না--সে ঝিনুকের মুখোমুখি হয়ে নিশ্চল ভাবে দাঁড়িয়ে থাকল। 

                              সমাপ্ত

গল্প -- বাঘিনীর সঙ্গে প্রেম --শংকর ব্রহ্ম

গল্প --  

বাঘিনীর সঙ্গে প্রেম --

শংকর ব্রহ্ম

-----------------------------------

আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি যে এটা একটা বাঘিনী ছিল। আমি তার গড়গড় আওয়াজ শুনেছিলাম শুধু।

আমার বাড়ির ভেতরের প্রবেশের পথটি খোলা ছিল, আমি দেখলাম সে সেখান দিয়ে ঢুকেছিল। ঢুকেই সে এদিকে সেদিকে দু'একবার তাকাল। ভাবলো একটু কিছু । তারপর

আমার ঘরে ভিতর অন্ধকারে সে এসেছিল, এসে আমার পাশে এসে শুয়ে পড়ল, আধো আলোতে দেখে আমি পরে চিনলাম এটা একটা বাঘিনী।

         শুয়ে পড়ে সে গভীর এবং স্বাভাবিক শ্বাস নিচ্ছিলো এবং শীঘ্রই ঘুমিয়ে পড়ল, মনে হলো। তার গা থেকে লতা পাতার  ভেজা তাজা গন্ধ আসছিল। একটি বন্য প্রাণীর গন্ধ যা আমাকে ভীষণ সম্মোহিত করে দিয়েছে। আমি এটা বলতে পারি যে সে রাতে একটি বাঘিনী আমার বাড়িতে এসে আমার পাশে শুয়ে পড়ল। প্রথমে তার গা ভেজা ছিল, তার ত্বক থেকে আর্দ্রতা ছড়িয়ে পড়েছিল, যা আমার চারপাশে এক শীতলতার সৃষ্টি করেছিল। 

আমার কাছে আসার জন্য অবশ্যই তার সাঁতার কাটার প্রয়োজন হয়ে পড়ে ছিল, কারণ কাছেই ছিল বড় একটা নদী, আর তার ওপারে বন।

শরৎকালের মতো শীতল বাতাস সমভূমি অতিক্রম করছিল এখানে আসছিল। গ্রীষ্মকাল এখনও বর্তমান এবং গরমের ভাবটাও তাজা আছে। বাতাস আসছিল দূরের নদীটা থেকে, এবং আমি তার জলজ গন্ধ নাকে টের পাচ্ছিলাম ভালভাবে। 

        রাতে আমিও ভাল ঘুমিয়েছি। বাঘিনীও ছিল চুপচাপ এবং মনেহয় ভাল ঘুম হয়েছে তার। 

        সকালের দিকে, উষ্ণতা ফিরে এসেছিল তাঁর শরীরে। যখন সকালে তার ঘুম ভাঙল, তখন সে ঘর থেকে বেরিয়ে, আমার বাড়ির সামনে বাগানে গিয়ে দাঁড়িয়ে 

বড় নদীটার দিকে তাকিয়ে ছিল।

আমি তাকে কাছে আসবার জন্য ইশারা করলাম 

এবং আমি তাকে মাংস খেতে দিলাম।

আমি আশা করেছিলাম যে সে হয়তো কাছে এসে আমার সাথে কিছু কথা বলবে, কিন্ত সে ছিল নীরব। তবে সময়ে সময়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল ,তার চোখ দেখে মনে হচ্ছিল আমাকে তার কিছুই বলার নেই। অবশেষে. আমি তার সাথে কথা বলার প্রত্যাশা ছেড়ে দিলাম। অন্য কাজে ব্যস্থ হয়ে পড়লাম। সে সেখানেই বসেছিল।

তবে প্রায়ই আমি তার সাথে আমার ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করতাম এবং আমি ভাবতাম যে সে সেগুলো বুঝতে পারছে।

যে রাতে, বাঘিনীটি আবার আমার পাশে ঘুমিয়েছিল। তারপরের দিন সে বাড়ির পাশে আমার আম বাগানে দিন কাটিয়েছি সূর্যের বিপরীতে, ছায়ায় বসে। মাঝে মাঝে আমি ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেতাম, দূরের বনের আর নদীর দিকে তাকিয়ে। আমি তাকে দেখতাম নদীর ধারে দাঁড়িয়ে সে প্রবাহিত জলের দিকে তাকিয়ে থাকতো।

সেদিন আমি তাকে বলতে গেছিলাম, 

'বেশ কিছুদিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে বাইরে যাব, তোমাকে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমার না থাকর সময়, তা বেশ কয়েক দিন ধরে চলতে পারে, তুমি বাড়ির ভিতরে বা বাইরে থাকতে চাও?

আমি দরজাটি তালাবন্ধ করব কিনা জানতে চাই। উত্তর না দিয়ে বাঘিনীটি শুয়ে পড়ল দ্বারপ্রান্তে, এবং আমি জানতাম যে আমার ঘর বন্ধ করার দরকার নেই, আমি চলে গিয়েছিলাম।

  আমি ফিরে এসে দেখি, বাঘটি খোলা চোখে শুয়ে আছে। আমাকে দেখে সে উঠে বসল। কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর উদাস ভাবে দূরে তাকলো।

   বাড়িটি যেমন ছিল তেমনি আছে। আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই এবং তার জন্য আমি কিছু মাংস নিয়ে এসেছি, তাকে জানাই। সে তার কোন প্রতি-উত্তর না দিয়ে আবার দরজার পাশেই শুয়ে পড়ে।

তার কিছুদিন পর আমি যখন নদীতে মাছ ধরতে যাই তখন সে প্রায়ই আমার সঙ্গে যেত। নদীর পাশে বসে থাকত। আমি যে মাছটি ধরতাম, তা মনোযোগ দিয়ে দেখতো। 

       যখন আমি বনের মধ্যে কাঠ কাটতে যেতাম (সেখানে সে ছিল) সে আমার সঙ্গে যেত এবং ফিরে এসে প্রতি রাতে সে আমার পাশে ঘুমাত। 

          তারপর একদিন সে ভোরের দিকে আমার বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেল ধীরে ধীরে এবং নিঃশব্দে।

         যাবার আগে সে আমাকে একবার স্পর্শ করল আমাকে জাগাতে, এবং সে তাকিয়ে রইল আমার মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে. আমি বুঝিনি যে সে চলে যাবে , তারপর সে ধীরে ধীরে আমার বাড়ির দরজা দিয়ে বেরিয়ে,  নদীর দিকে বৃষ্টিতে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল দেখে, 

আমি সে দিকে তাকিয়ে রইলাম। সাঁতার কেটে নদীর ওপারে সে চলে গেল। তখন টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল।

আমি আর বিছানা ছেড়ে উঠিনি। পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, একটু পরেই সে ফিরে আসবে। কিন্তু আশ্চর্য, সে আর ফিরে এলো না।

           আমি ভাবতে পারিনি যে চিরদিনের জন্য আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। জানতে পারলে , বুঝতে পারলে, হয়তো তাকে যেতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতাম।

আমি এখনও আশা করি যে সে আবার একদিন আমার কাছে ফিরে আসবে।

          আমি আজকাল আর নদীতে মাছ ধরতে যাই না। কিংবা যাই না বনে কাঠ কাটতে। আমার যেন এখন আর কোন কাজ নেই। কোন কাজ করতে আমার আর ভালও লাগে না।

         আমি এখন নদীর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকি, তার কথা ভাবি। যেদিন সে প্রথম এসেছিল, মনে পড়ে যায় সে কথা।  আনন্দ যেন সে আমার কাছ থেকে কেড়ে  নিয়ে চলে গেছে।

আজকাল আমি ঘুমোতে যাওয়ার আগে, একবার হলেও ভাবি তার কথা, একদিন হয়তো সে ফিরে এসে আমার পাশে শুয়ে পড়বে। ঘুমের মধ্যে , আমি তার গাঢ় শ্বাস ফেলার শব্দে জেগে উঠে দেখব সে আমার পাশে শুয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। আমি আজকাল একা একাই শুয়ে থাকি । আর ঘুম আসে না রাতে , তার কথা ভাবতে ভাবতে ভোর হয়ে যায়। আমি বাইরে বেরিয়ে এসে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি। একটা কিছু সাতার কেটে আমার দিকে আসছে যেন দেখতে পাই। তারপর সন্ধ্যা নেমে এলে চরাচর জুড়ে, আমি হতাশ হয়ে বড়ি ফিরে আসি।

গল্প--মনের কোণে ধুলো --কবিরুল (রঞ্জিত মল্লিক )



গল্প--

মনের কোণে ধুলো --
কবিরুল (রঞ্জিত মল্লিক )

         ডিউটি শেষ করে মেজর জেনারেল যোগিন্দর সিং যখন আর্মির বেস ক্যাম্পে এসে পৌঁছল তখনই সিনিয়র অফিসার তাকে ফোনটা করেন। একটা টুরিস্ট বাসকে  জঙ্গীরা আটক করে রেখেছে। সেই বাসে ষাট জন যাত্রী জঙ্গীদের কবলে পড়ে নিদারুণ বিপদের সন্মুখীন। তাদের মধ্যে এক বিবাহিত মহিলা জঙ্গীদের চোখে ধুলো দিয়ে বাস থেকে নেমে পালিয়ে যায়। কিন্তু কিছুদূর যাবার পর মেয়েটা পথ হারিয়ে যায়।

            জঙ্গীদের কবল থেকে ঐ টুরিস্ট বাসটিকে উদ্ধারের দায়িত্ব যোগিন্দর সিং কে দেওয়া হয়। সেই সাথে ঐ মেয়েটিকেও উদ্ধার করতে হবে। যোগিন্দরকে একটু টেন্সড্ দেখাল। এক কাপ কফি খেয়েই ও নিজের গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সিনিয়র অফিসারের সাথে দেখা করতে।

           সিনিয়র অফিসারের সাথে আলোচনা করে নিজের দায়িত্বটা বুঝে নিল। তারপর বেরিয়ে পড়ল অপারেশনের উদ্দেশ্যে। আজ যোগির কাছে এটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। জঙ্গীদের কবল থেকে বিপন্ন যাত্রীদের ওকে উদ্ধার করতেই হবে।

            নিজের মোবাইলে জিপিএস টা অন করেই অপারেশনের একটা সুন্দর ছক কষে ফেলল। তারপর অনেক সার্চ করার পর লোকেশন ট্রেস করে জঙ্গী সমেত জঙ্গী কবলিত বাসটা খুঁজে বার করল। নিজের জীবন বিপন্ন করে জঙ্গীদের সাথে দারুণ লড়াই করে যাত্রীদের উদ্ধার করল। দু একজন জঙ্গী মারাও গেল। তবে পালিয়ে যাওয়া সেই মহিলার এখনও কোন খোঁজ পাইনি। ওকেই এখন খুঁজে বার করতে হবে।

            যোগি একটা জিনিস বুঝতে পেরেছে মেয়েটা কাছাকাছি কোথাও না কোথাও আছে। বেশ কিছুটা পথ যাবার পর জঙ্গলের পাশ দিয়ে একটা রেল লাইন চলে গেছে। রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা মহিলাদের  ছোট পার্স পাওয়া গেল। তাতেই যোগি সিউর হল যে মহিলা এই দিক দিয়ে গেছে। মহিলার পার্সটা খুলতেই কেমন চমকে উঠল। ভিতরে একটা ছবি। ছবিটা তার খুব চেনা। তার বহুদিনের পরিচিত মানালীর ছবি। মানালীর সাথে অনেক দিন হল কোন দেখা নেই। জানেনা ও কেমন আছে। তবে এভাবে মানালীর স্মৃতি ফিরে আসবে ও ভাবতেই পারেনি। চোখটা ছলছল করে উঠল।

             যোগিন্দরের সাথে মানালির এক বিয়ে বাড়িতে আলাপ। তারপর আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বারে। পরে সেই ঘনিষ্ঠতা প্রেম অবধি পৌঁছায়। যোগিন্দর বারো ক্লাস পাশ করার পর আর্মির চাকরির জন্য পরীক্ষা দেয়। যোগির পরিবার ভীষণ অভাবী। ওর একটা চাকরি হলে পরিবারটা বেঁচে যায়। যোগি একটা যব পাবার জন্য তাই ভীষণ চেষ্টা করছে।

            মানালির পরিবার বেশ উচ্চবিত্ত। ওর আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন। ও চাই যোগি অনেক অনেক বড় পদে চাকরি করূক। বড়লোকের মেয়ে বলে মানার একটু ঠাট বাঁট ও আছে। সময়ে অসময়ে ও যোগিকে হেয় করতেও ছাড়েনা।

             একবার মানার জন্মদিনে ওর বাবা একটা বিশাল বড় পার্টি দেয়। বেশ গন্য মান্য আর প্রভাবশালী  ব্যক্তি এই অনুষ্ঠানে আসে। যোগিও আসে। তবে যোগি একটা অতি সাধারণ মানের গিফ্ট দেয়। তাতে মানার মনে খুব লাগে। মানা ভেবেছিল যোগি অন্যদের মত দামী গিফ্ট দেবে। যোগিরও এতে অভিমান হয় একটু। তবু ও মানাকে ভালবাসে। তাই মুখে কিছু বলেনা।

              এরপর আস্তে আস্তে মানা আর যোগির রিলেশন তলানিতে এসে ঠেকে। মানার জীবনে আদিত্য এসে হাজির হয়। ও বিশাল বড়লোকের ছেলে। পরে যোগি আর্মিতে একটা ভাল চাকরি পাই। যোগির আর্মিতে যোগদান মানা মেনে নিতে পারেনা। মানা আস্তে আস্তে যোগিকে ভুলে যায়। কিন্তু যোগি মানাকে  আগের মতই ভালবাসে।

             পরে মানার সাথে আদির ছাড়াছড়ি হলে  মানা অন্য একটা শিল্পপতির সুযোগ্য ছেলেকে বিয়ে করে। স্বার্থপর মানা যোগিকে বিয়েতে ইনভাইট পর্যন্ত করেনি।

             এরপর অনেক বছর কেটে গেছে।

                     .....   ......   .......   .........

           আজ ছবিটা দেখে মানালীর জন্য মনটা ছটফট করে ঊঠল। ও জানে মানালী এখানে কোথাও লুকিয়ে আছে। জঙ্গীদের ভয়ে বেরোতে সাহস পাচ্ছেনা। অন্ধকার আরো সবল হচ্ছে। যোগি রেললাইনের দুই ধারে খূব খোঁজাখুঁজি করল। তারপর বেশ অনেকটা পথ পেরোবার পর একটা পোড়ো মন্দির দেখতে পায়। ওখানেই ও ওর আদরের মানাকে দেখতে পাই। লুকিয়ে ছিল।


            মানা যোগিন্দরকে অন্ধকারে চিনতে পারেনি। তারণর একটু আলোর রেখা দেখতেই যোগিকে চিনতে পারে। মানা নিজের ভুলটা বুঝতে পারে। ও যোগির কাছে ফিরতে চাই। আদির সাথে মানার রিলেশনটা সুখের হয়নি। কারণ মানার বাসনা অসীম। পরে শিল্পপতির ছেলেও মানার অভিসন্ধি বুঝতে পারে। যদিও সে মানাকে বিয়ে করে দু বছর পরে ডিভোর্স দিয়ে চলে যায়।মানালী এখন ভীষণ একা।অনেকদিন পরে যোগিকে সামনে পেয়ে নিজের মনের কথা গুলো বলে নিজেকে হালকা করল।

            গল্প করতে করতে কখন যে সময়টা কেটে গেছে ওরা জানতেই পারেনি। মানার লাগেজটা হাতে ধরে নিজের গাড়ি অবধি এগিয়ে নিয়ে গেল যোগিন্দর। সীট বেল্টটা শক্ত করে বেঁধে নিল।আদরের মানাকে জঙ্গীর কবল থেকে মুক্ত করে পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে চলল নিজের আর্মির কোয়ার্টারে।

             যোগির সাজানো ঘর গুলো দেখে মানার ঈর্ষার পারদ অনেকটাই বেড়ে গেল। ও ভাবতেই পারেনি গ্রামের ছেলে নিন্মবিত্ত যোগিন্দর এতটাই বদলে ফেলবে নিজেকে।  মানালী বুঝতে পেরেছে যে সে হেরে গেছে। রাতের ডিনারেও যোগি মানার আর্থিক মর্যাদার সাথে সঙ্গতি রেখে খাবারে চমক এনেছে। যোগিকে হেয় করা যে তার উচিৎ হয়নি সেটা মানা বুঝতে পেরেছে।

               রাতের ঘুমটা খুব ভালই হয়েছে মানালীর। ঘুম ভাঙ্গতেই দেখে যোগির ঘরের সামনে সোনা রোদের ঝরণা ঝলমল করছে।

            ড্রেসিং টেবিলের কাছে দাড়াতেই চোখে পড়ল একটা কার্ড। কার্ডে জ্বল জ্বল করছে - 

                " Happy Birth Day

                      My dear Manaly "

          মানালি ভুলেই গিয়েছিল যে আজ তার জন্মদিন। শত বিপদ , ঝুঁকি আর কাজের মধ্যে থেকেও যোগিন্দর তার জীবন শুধু বাঁচায় নি তাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে এনে ছিল তার নিজের আলো ঝলমল বাসায়। তার জন্মদিন পালন করে তাকে ধন্য করে ছিল। যোগিন্দর আজ বিশাল বড় আর্মি অফিসার। ওর আজ অনেক নাম ডাক।

              দুপুরের একটু আগেই সাইরার ফোনটা বেজে উঠেছিল। দুমাস পরেই ওর আর সাইরার শাদি। যোগিন্দর নিজের গাড়িতে উঠেই গাড়ি স্টার্ট দিল। একরাশ ধুলো উড়িয়ে গাড়িটা সোজা ছুটে গেল শপিং মলের দিকে।

              পিছনে পড়ে থাকল জমাট ধুলোর মেঘ আর মানালীর নীরব কান্না।

            মানালীর মনের কোণে জমে থাকা দীর্ঘ দিনের  ধুলো একটু একটু করে ঐ জমাট ধুলোর মেঘের কলেবর বৃদ্ধি করল।


ঊশ্রী মন্ডলের কবিতা --

ঊশ্রী মন্ডলের কবিতা --
আমি উলুপী

স্মৃতির কুঠূরিতে সে ঘটনাগুলি হায়..
আজও জ্বল জ্বল করে জ্বলছে মনভূমিতে স্বমহিমায় ,
দেখেছিলাম কুন্তী পুত্র বিশ্ব জয়ি সেই শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধরকে  ;
এসেছিলো সে বনবাসে বিবাহের শর্ত লঙ্ঘনের কারণে ,
আমিও ছিলাম তারি অনুসরণে..|

স্নানরত অর্জুনকে মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম..
নিজের করে পাবার কামনায় বিবাহের প্রস্তাবও দিলাম ,
প্রথমে তিনি রাজি হতে চাচ্ছিলেন না কিছুতেই- কিন্তু..
আমার কথায়,যুক্তিতে অবশেষে রাজি হয়ে যান ;
এসেছিলো আমাদের মিলনের পুত্র ইরাবান..।

বাল্যকাল হতেই মাতৃগৃহে সে পালিত..
তাই নিজ পুত্রের কথা অর্জুন না জানতো ,
তৃতীয় পান্ডব তখন সুরলোকে নিচ্ছিলো অস্ত্র শিক্ষা একাগ্রচিত্তে ;
ইরাবান তাঁর নিকটে গিয়ে দিলো নিজ পরিচয়,
পরস্পর আর রইলো না অজ্ঞাতপরিচয়..|

মোর পুত্র দিয়েছিলো কথা পিতারে..
অবশ্যই আসবে যোদ্ধা বেশে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে প্রয়োজনানুসারে ,
চলল পুত্র পিতার আহ্বানে ভীষণ রণে অতীব বিক্রমে ;
ঝাঁপিয়ে পড়লো করলো নাশ নিদারুনে পান্ডব বিরোধীদের ,
নিলো নব পরিকল্পনা জেতাতে পান্ডবদের..|

কোনও বীরপুরুষ কালাপ্পালি প্রথার যুদ্ধে ..
দেবী কালীর সামনে নিজেকে উৎসর্গ করেন শুদ্ধে ,
বিশ্বাস কর, তবেই হবে সেই পক্ষের জয় অবশ্যম্ভাবী ;
ইরাবান পাণ্ডবপক্ষ থেকে উৎসর্গের  ইচ্ছা প্রকাশ করে ,
নিজেকে বলি দিতে চায় অকাতরে..|

সন্তুষ্ট শ্রীকৃষ্ণ হতে তিনটি বর লভে..
একটি - যুদ্ধে বীরের মৃত্যু বরণ করা জয়লাভে,
দ্বিতীয়টি - আঠেরো দিনের যুদ্ধ পুরোটা দেখার সৌভাগ্য লাভ ;
তৃতীয়টি - দাহ না করা হয় ,মৃত্যুর পর,
এই রূপ ব্যবস্থাই রইলো অতঃপর..|

সে সময়ের রীতি ছিলো অন্যরূপ..
অনূঢ়দের মৃত্যুতে দাহর পরিবর্তে কবরস্থই ছিল সত্যরূপ ,
এই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় পর্যন্ত ইরাবান ছিলো অবিবাহিত  ;
কোনও নারী তাঁকে চাইছিল না বিয়ে করতে ,
অতঃপর শ্রীকৃষ্ণ নিলেন উপায় ব্রতে..|

শ্রীকৃষ্ণ নারীরূপ ধারণে হলেন মোহিনী..
বিয়ের পড়ে মৃত্যুআগে একরাত কাটান হয়ে গৃহিনী , 
আরাবনের মৃত্যুর পর শ্রীকৃষ্ণ বৈধব্য বেশে করে শোকপালন  ;
পরের দিন আবার আসল চেহারায় ফিরে আসেন,
এইভাবেই তিনি সকল শর্তপূরণ করেন..|

আত্মবলির পর বত্রিশ টুকরোর দেহাংশ ..
কালীর কাছে উৎসর্গ করা হয় সকলই খণ্ডাংশ ,
যুদ্ধক্ষেত্রে এক খুঁটির আগায় চড়িয়ে রাখা হয় কাটামুণ্ডু  ;
সেখান থেকেই সমস্ত কিছু তার গোচরে আসে
তাঁর ,
আকাশে বাতাসে ভাসে হাহাকার..|

আমি নাগরাজ কৌরভ্যনাগের কন্যা উলুপী..
আজও সন্তান হারানোর বেদনায় কাঁদি নিজেকে কোপী ,
কিন্তু কুন্তীপুত্র অর্জুন তোমায় অকৃপন ভালোবেসে ছিলাম ;
ধর্মানুযায়ী যুদ্ধ ক্ষেত্রে ইরাবানকে যেতে অনুমতি দিয়েছিলাম,
তাই সম্পূর্ণ একাই রয়ে গেলাম..|

প্রণয় ও অভিমান

          শোন লো শ্রীমতি রাধারাণী..
  শুনে , ওই বংশীধ্বনি-হোস না পাগলিনী ,
          যাসনে রে , সেথায় একাকিনি ;
      ঘরে আছে ননদিনী , সে কটুভাষিণী ,
       পারবি কী সইতে -ওরে মৃদুভাষিণী ?

            এলো যে ঘনিয়ে নিশীথিনী..
বয়ে চলে কল্লোলিনী,সেযে সদা আমোদিনী,
            শোন সরীসৃপের সরসরানী ;
         উলূকের ওই কর্কশ তীক্ষ্নধ্বনি ,
          জংলী হায়নার হিংস্র হাহাধ্বনি  |

              ওরে কানু বাজাসনে বেনু..
    রাধারানী প্রেমে স্থানু,হলো যে মগ্ন মজনু,
             সরসী বিম্বে দেখে তব অতনু ;
           ক্রমাগত কৃশ হচ্ছে এ গৌর সুতনু ,
           মোহ মুক্ত কর বলি করে নতজানু  |

              মিলন আশে নিচ্ছে যতন..
    ফনী করে সম্মোহণ , বেচে হাতের কঙ্কন ,
             ভূমি করে পিছল ইচ্ছামতন ;
          পদতল ঐ কন্টকে করে আঘাতন ,
            নিরব চলার কামনায় সচেতন  |
          
              অভিশারে চললো মোহিনী..
        উৎসর্গের ইচ্ছায়,হ্লাদিনী হলো লাবণী,
              সঙ্কেত কুঞ্জে এলো বৃষনন্দিনী ;
          দেখে কৃষ্ণ নাই হেথা হলো বিষাদিনী ,
           হৃদয় করে কোপে পূর্ণ অভিমানিনী  |

               শক্তির ক্রোধে ফুল শুকায়..
       সমগ্র বৃন্দাবনেই , হাহাকার মেচে যায় ,
               শুনে কানাই বরসনায় ধায়  ;
          ফুল দিয়ে মানিনীর মান যে ভাঙ্গায় ,
            চারো দিশা গায় গীত একলহমায়  |

                 বিনা প্রেমে জীবন বিবর্ণ...
          প্রণয় অভিমান , পরস্পরেই পরিপূর্ণ ,
               বিশ্বাস, সম্মান, দায়িত্বই গণ্য  ;
     ঊশ্রী বলে চাই হতে ঐ শুদ্ধ অমৃতে পূর্ণ,
    শেষ ভালো যার,তার সবই ভালো অনন্য |


আমি প্রণমী 


তখন ছিলো সময়টা ৫৬৩ বি.সি. পৃথিবীর..
শুদ্ধোধন ছিলেন , গোষ্ঠী প্রধান-শাক্য গোষ্ঠীর ,
পত্নী মায়াদেবী ,পদ্মফুল শ্বেতহস্তী-স্বপ্নে দেখলেন..
কোল্লীয় রাজ্যের রাজকুমারী পিতৃগৃহে চললেন ,
পথেস্থিত ,লুম্বিনীবাগানে শালবৃক্ষের তলে জন্মিলেন-তথাগত..
এরপরই ,সাতদিনের মধ্যে-মাতা হলেন গত ;
মহাপ্রজাপতি গৌতমী , পালন করেন-জননীহারা সিদ্ধার্থকে..
শাক্যমুনি , গৌতম নামে -পরিচিত হলেন এথেকে  l

জাতকের মধ্যে , মহাপুরুষের লক্ষণ আছে-বললেন কুলপুরোহিত..
যুবাবস্থায় , বিবাহবন্ধনে যশোধরার সহিত হলেন- নববিবাহিত,
তাহাদেরই , সংসারধর্মে রাহুল- পুত্র রূপে জন্মায়..
সাতদিনের পরেই , গৌতম -গৃহত্যাগ করে যায় ,
জরা , ব্যাধি , মৃত্যু ,অনাসক্ত আনন্দিত সন্ন্যাসী..
দেখে সিদ্ধার্থ , করলেন গৃহত্যাগ- হলেন পথবাসী ;
শান্তির আশে , নিজ হৃদয়- করলেন উন্মোচিত..
এই ঘটনা ,বৌদ্ধধর্মে মহাভিনিষ্ক্রমণ নামেই- পরিচিত |

গৃহত্যাগের সময় , কিছুদূর যায়-ঘোড়া কন্থক..
সঙ্গে ছিলো ,প্রিয় সারথী - বন্ধু ছন্দক ,
সংসার ত্যাগের পর প্রথমেই যান বৈশালী..
সেইখানেই ছিলেন প্রথম গুরু অত্যন্ত জ্ঞানশালী ,
দর্শনের অন্যতম সাধক সাংখ্য আলারা কালাম..
শিক্ষা গ্রহণেও মনখিদে মেটাতে হলেন নাকাম ;
এরপর গুরুরূপে নির্বাচন করলেন রুদ্রক রামপুত্রকে..
পঞ্চভিক্ষুর সাথে ধ্যানে বসলেন উস্কাতে উপলব্ধিকে l

ঘুরতে ঘুরতে গয়ার কাছে উরুবিল্বগ্রামে আসেন..
বোধগয়া নামে পরিচিত -সেখানে ধ্যানে বসেন ,
স্থানীয়মেয়ে , সুজাতার দেওয়া-একবাটি পায়েস খান..
নৈরঞ্জনা নদীর তীরে অশ্বত্থতলে ধ্যানেতে বসেন ,
এরপরেই তিনি বোধিত্ব লাভে হন অববুদ্ধ..
সেই অশ্বত্থ বৃক্ষ বোধিবৃক্ষ নামে প্রসিদ্ধ  ;
বুদ্ধত্ব অর্জনে নাম হয় বুদ্ধ ,তথাগত..
বুদ্ধ শব্দের অর্থ , যে জ্ঞানপূর্ণ শাশ্বত  |

জ্ঞানকে প্রসার এবং মানুষের দুঃখ নিবারণে..
তথাগত করলেন যাত্রা ধর্ম ও জ্ঞানবিতরণে ,
সারনাথের মৃগদাব বাগানে প্রথম করেন ব্যাখ্যাত.. পঞ্চভিক্ষুর নিকটে ,তাহাই - ধর্মচক্রপ্রবর্তন নামে খ্যাত ;
বুদ্ধদেব ,শিষ্যদের জন্য -সংঘ প্রতিষ্ঠা করলেন..
সমবায় ও একতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য সম্মুখে রাখলেন ,
দূর করেন , জাতিভেদজনিত ,সকল সংকীর্ণ মানসিকতাকে...
মুক্তির পথ দেখালেন ধর্মের জটিলতা থেকে ।

কণিষ্ক বৌদ্ধধর্ম ভারতে ও বহিরবিশ্বে ছড়ান..
সম্রাট অশোকও একই পন্থা গুলি আওড়ান ,
তৎকালীন ভারতবর্ষে বুদ্ধদেবের ধর্মমতে হয়েছিল একত্রিত..
সকলশ্রেণীই , সহজ সরল ধর্মজে হয়েছিল সন্মত ,
জীবিতকালে তাহার উপদেশাবলী ধর্মনীতি হয়নি লিখিত..
মুখেমুখে জনগণের সহজবোধ্য ভাষায় হতো ঘোষিত ;
তিনি কখনই করেননি বঞ্চিত জ্ঞান হতে..
প্রানভরে সেইসব দান করে গেছেন অনন্যচিত্তে |

গৌতমবুদ্ধ ৪৮৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে আশি বছর বয়সে..
দেহত্যাগ করেন গোরক্ষপুরের কুশীনগরে শেষ নিঃশ্বাসে ,
মহাপরিনির্বাণের পরে তার বাণী করতে সংকলন.. রাজগৃহে প্রথম বৌদ্ধ সম্মেলনের হয় আহ্বান ,
এস্থানে সপ্তপর্ণী পর্বত গুহায় অনুষ্ঠিত এ'সংগীতি.. মহাত্মার উপদেশাবলী দুখন্ডে সংকলিতরূপে হচ্ছে প্রতীতি ;
বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি,ধম্মং শরণং গচ্ছামি..
সংঘং শরণং গচ্ছামি , এ'বানীরে আমি প্রণমি |

কাব্য -- বীরবাহু বধ --রমা গুপ্ত

কাব্য -- 

বীরবাহু বধ --
রমা গুপ্ত

শোকাগ্ৰস্ত  লঙ্কাপতি    বীরবাহু তরে
বিষাদে নিঃশ্বাস ছাড়ে   বলে ক্ষীণ স্বরে
হে বীর লঙ্কার তুমি        কুলের প্রবর
রাক্ষস কুলেতে জন্ম     প্রতাপ প্রখর।
স্তম্ভিত হয়েছে রাম        মনে খুশি তাই,
তোমার মতন বীর         বুঝি দেখে নাই।
হায় পুত্র বীরবাহু           বাহুবলি কত
হৃদয়েতে বজ্র যেন         হানে ব্যথা শত।

 ওরে  ভগ্নী সূর্পনখা!      তোর অপমানে
ক্রোধান্বিত হয়ে কেন,     গেলাম সে স্থানে!
মতিভ্রম হলো শেষে        ছদ্মবেশ ধরে 
রাম লক্ষ্মী হরণের          পাপ স্পর্শ করে।
অন্তরেতে হাহাকার         নেই পরিসীমা
হৃদি বৃন্তে ফোটা ফুল       স্নেহ মধুরিমা,
কেউ যদি নেয় ছিঁড়ে        রক্ত ক্ষরণেতে
নিস্তেজ হয় যে দেহ          শোক আবহেতে।

যন্ত্রণা অনলে পুড়ে           মরি আমি। যাও
মন্দোদরী, চিত্রাঙ্গদা        কে সান্ত্বনা দাও।
বাক্যহীনা চিত্রাঙ্গদা         বসে পুত্র ধরে
মন্দোদরী গেলে কাছে     বলে সকাতরে,
দিয়েছি সন্তান যবে         লঙ্কেশের কাছে  মনে মনে জানি পুত্র        সুরক্ষিত আছে।
মেনে নিতে পারিনা         যে এই অঘটন,
হৈমপুরী রক্ষা হেতু           বধ মম ধন।

ততক্ষণে সভা মধ্যে         প্রজাদের ভীড়
বীরবাহু বধে সব              বিষণ্ণ গম্ভীর।
লঙ্কাপতি এসেছেন           ধীর পদে অতি,
চিত্রাঙ্গদাকে  বলেন          শান্ত রাখো মতি।
বিভীষণ করেছে যে,         মৈত্রী বৈরী সাথে
লঙ্কা রক্ষা ভার দিই          বীরবাহু হাতে।
মোক্ষম সমরে রক্ষে          প্রাসাদ লঙ্কার 
কুলরত্ন বীরবাহু                রাজ্য অলঙ্কার।

ক্রন্দন করোনা প্রিয়ে        হৈমপুরী ধনি,
সমরেতে জিতেছে সে      বীর চূড়ামণি।
ক্ষিপ্ত কণ্ঠে চিত্রাঙ্গদা        বলেন, রতন
দিয়েছিল দেব মোরে,       রক্ষার্থে যতন
আপনাকে দিই, পাখি       যেমন শাবকে
রাখে লুকিয়ে কোটরে,      বলুন পুত্রকে 
রেখেছেন কোন্ খানে?     প্রজাগনে  রক্ষা
নৃপ ধর্ম। তবে কেন           পেলোনা সুরক্ষা!

পুত্র আমার হায় রে!        বিধির কেমন
বিচার! রাঘব ক্ষুদ্র           নয়  বলে মন,
যাঁর নামে শিলা ভাসে      সমুদ্র  মাঝার
ঈশ্বরীয় হবে কেউ           ঐশ্বর্য অপার।
বশিভূত কপি জাতি        করছে সমর,
মানুষ নয় দেব সে,          নিশ্চিত অমর।
হয় যদি দেবতা সে          ভাগ্যবান মানি,
ভগবান হস্তে বধ             সদা শুভ জানি।

কবিতা -- ফিরিয়ে দাও--সৌদামিনী শম্পা

কবিতা --  ফিরিয়ে দাও সৌদামিনী শম্পা  ছেড়ে এসেছি দিনগুলো অতীতের ছায়ামাখা পথে। শান্ত শীতল দিন, ঝড়হীন, দোলাচলহীন, বড় অমলীন সে ...