জীবনের জীবন রেখা
সুব্রত ভট্টাচার্য্য
রেওয়া, মধ্য প্রদেশ
"বিষন্নতা কেন? বেশ তো সুস্থ লাগছে! কী পড়ছিস্, চিঠি?", তপন জীবনকে জিজ্ঞাসা করল। জীবন উত্তর দিল, "আমার ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধু, নবজীবনের চিঠি। 'জীবন - নবজীবন' নামের যেমন মিল, আমাদের বন্ধুত্বেরও তেমনি মিল। দুজনেই ইন্জিনিয়ারিং পাশ করলাম। আমি ভারতেই ভালো মাইনের একটা বেসরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হলাম। নবজীবন আমেরিকা চলে গেল। এখন সে ওখানেই থাকে আর আমাকে তো তুই দেখতেই পাচ্ছিস। পঁচিশ বছর হয়ে গেল আমাদের দেখা সাক্ষাৎ নাই। দশ বছর আগে এই চিঠিটা নবজীবন আমাকে লিখেছিলো। পড়ে দেখ।" তপন পড়তে লাগলো -
"সুপ্রিয় জীবন,
আমাদের মিত্রতার মিষ্টতাটা এতোটাই সুমধুর যে, মনে হচ্ছে, বন্ধুত্বের তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। তোর জীবনে যে অশান্তির ঝড় উঠেছে এটা আমার জানা তো দূরের কথা, অনুমান করতেও পারছি না। আমার ওখানে থাকাকালীন, তোদের পরিবারে তো এমন অশান্তির পরিবেশ ছিল না। তরুণ, সুমন, শেফালী, শ্যামলী ও তুই - একই গাছের শাখা, দরিদ্রতা থাকলেও পারিবারিক সুখশান্তির অভাব ছিল না। তাছাড়া, তোর স্ত্রী তো এক আদর্শ শিক্ষিকা! মনোমালিন্যের এই বিষাক্ত রূপ যে তোর বিবাহিত জীবনে অসহনীয় অশান্তি সৃষ্টি করেছে সেটা ভাবতেও পারছি না। আবার এটা জেনেও অবাক হচ্ছি যে, বিয়ের পর মা ও ভাই-বোনেরাই হলো তোর এই বিপদমুখী জীবনের প্রধান কারণ। তোর জীবনের এই হঠাৎ অসহনীয় পরিস্থিতি উপলব্ধি ক'রে খুবই মর্মাহত হলাম। হে ভগবান! বিপদের দুর্বিষহ ঘূর্ণিঝড় থেমে যাক এবং সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে উঠুক! তোর মতো মেধাবী ছেলে, গুণবতী স্ত্রী এবং তোদের সন্তান আজ্ঞাধীন ও বিনম্র যুবরাজ - সকলের জীবনে সুখ ফিরে আসুক! ..."
"সত্যিই! জীবন যে বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ভুগছে এবং মদের নেশায় নিমগ্ন থাকছে, যার জন্য সে আজ চাকরিহীন, তার একমাত্র কারণ তো ঐ সংসারের অশান্তি। আজ জীবন বড়ো অসহায়!" একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে, তপন এটাই ভেবে জীবনের দিকে একটা সহানুভূতিশীল ভাব প্রকাশ করল। অশান্তির আঁচলে কাতরানো এবং বাইপোলার ডিসঅর্ডার রোগে আক্রান্ত জীবনের জীবন তপনের কোলে মাথা রেখে অজস্র অশ্রুর আশ্রয় নিয়ে চিত্তে একটু স্থিরতা আনার চেষ্টা করতেই বাইপোলারের আক্রান্তে উন্মাদ হয়ে উঠল। তপন একটা সিগারেট জীবনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে ওকে শান্ত করল এবং নিজের চোখের জলটা রুমাল দিয়ে লুকানোর চেষ্টা করল।
No comments:
Post a Comment