মা আসছেন যে !
গোবিন্দ মোদকের কবিতা ও অণুগল্প
নীলাকাশ তার কথা রেখেছে –
তার অবারিত সামিয়ানার বুকে
ভাসিয়ে দিয়েছে পেঁজা মেঘের ভেলা।
শিউলিও তার কথা রাখতে ভোলেনি –
গেরুয়া-সাদা ইউনিফর্মে সেজে
বুকে করে বয়ে এনেছে সে শারদ আলো।
নদীর ধারের কাশও সামিল হয়েছে সেই শুভ কাজে,
শঙ্খ বাজিয়ে স্বাগত জানিয়েছে জবা টগর স্থলপদ্ম।
আদর করে ভোরের শিশির
ঘাসের বুকে রেখেছে তার প্রথম চুমুচিহ্ন,
শারদ রোদ তাতে সলমা-জরি সাজিয়েছে;
মুক্তোকণার মতো হেসে উঠেছে শিশির-বিন্দু,
আর সেই অবকাশে খালে-বিলে মাথা তুলেছে
অজস্র শাপলা-শালুক,
দিঘির বুকে মাথা তুলেছে প্রথম পদ্মকলি;
আর শিল্পীপাড়া জেগেছে তুমুল ব্যস্ততায়,
মহালয়া দোরে এসে দাঁড়িয়েছে।
এবার হাতে তুলি তুলে নাও
ওগো নিমগ্ন শিল্পী, মা আসছেন যে!
============================
অণুগল্প
হায় রে দুর্ভাগা দেশ!
গোবিন্দ মোদক
স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল সুমন। আজ স্কুলে খুব আনন্দ হয়েছে। হেডস্যার জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবার সময় সুমনও সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে বন্দেমাতরম্! জয় হিন্দ! পনেরোই আগস্ট জিন্দাবাদ! স্বাধীনতা দিবস জিন্দাবাদ! ইত্যাদি স্লোগান দিয়েছে। তারপর ওদের গেম টিচার কুশলবাবু বক্তব্য রেখেছেন। পনেরোই আগস্ট কি ও কেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার স্বাধীনতাযুদ্ধের বিপ্লবী এবং শহীদদের সম্পর্কে অত্যন্ত সুন্দর বক্তব্য রেখেছেন। ইতিহাসের স্যার দীপকবাবু ভারতের জাতীয় পতাকার তিনটি রঙের তাৎপর্য ও নীলরঙের অশোকচক্রটি সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন। এখন সুমনও জানে যে পতাকার উপরে থাকা যে গেরুয়া রং তা ত্যাগ ও ঐতিহ্যের প্রতীক। মাঝখানের সাদা অংশটি শান্তি ও মৈত্রীর পরিচয় বহন করে। আর পতাকার সবচেয়ে নিচে থাকা সবুজ রংটি সাহস ও বীরত্বের প্রতীক। আর নীল রঙের যে অশোকচক্রটি রয়েছে তাতে রয়েছে চব্বিশটি দন্ড যেগুলির পৃথক পৃথক ব্যাখ্যা আছে।
স্যারদের বলা এই কথাগুলো মনে করতে করতে সুমন ফিরছিল। এমন সময় পাড়ার রাস্তার পাশে সুভাষ সঙ্ঘের মাঠে পতাকা উত্তোলন ওর চোখে পড়ল। কি সর্বনাশ! পতাকাটা উল্টো লাগিয়েছে ওরা! সবুজ রং উপরে উঠে গেছে! সুমন চিৎকার করে জানালো যে পতাকাটা উল্টো লাগানো হয়েছে! কিন্তু ছোট ছেলে বলে সুমনের কথার কেউ গুরুত্ব দিতে চায়না! সবমিলিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি, হৈ-হট্টগোল! কর্মকর্তাদের একজন তো সুমনকে ঘাড় ধরে মাঠের বাইরে বের করে দিয়ে বললো- এই বয়সেই বেশি বুঝে গেছিস! ভাগ এখান থেকে।
অপমানে সুমনের চোখে জল এসে গেল। ঘটনা লক্ষ্য করে এগিয়ে গেলেন পাড়ার প্রবীণ বারীনবাবু। তিনি বললেন- যে দেশে জাতীয় পতাকা উল্টো করে উত্তোলিত হয়, সে দেশের আর কি উন্নতি হবে! এসো সুমন জেঠু, তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিই। সুমন তার চোখ মোছার অবকাশে দেখতে পেলো কর্মকর্তাদের মাথা ততক্ষণে নুয়ে পড়েছে।
============================
No comments:
Post a Comment