Sunday, 9 October 2022

অণুগল্প --“অভিমান” --প্রীতম সরকার

অণুগল্প --


“অভিমান” --

প্রীতম সরকার

আজ মহা সপ্তমী। সুখেন বাড়ির দাওয়ায় বসে লন্ঠনের আলোয় বিড়ি বাঁধছে আর দেখছে, কিছু দুরের পুজো মন্ডপে আলোর ঝলকানি। বছরের এই সময় এলেই মন খারাপ হয়ে যায় সুখেনের। পুরানো দিনের কথাই ভাবছিল সুখেন। দূর্গাপুজোর মন্ডপে অনেক রাত পর্যন্ত আনন্দই না হতো, পুজোর উদ্যোক্তাদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতো সে। তখন সে অবিবাহিত ছিল। বিয়ে করার কয়েক বছরের পরেই দুর্গাপুজোর আনন্দ জীবন থেকে এক রকমের মুছেই গিয়েছে। তাঁর দুই ছেলেও পেলনা দুর্গাপুজোর আনন্দ।  

 কিন্তু এখন দিন বদলেছে। এখন দেশের সুরক্ষার স্বার্থে ভারত-বাংলাদেশের বর্ডারে কাঁটা তারের বেড়া দিয়েছে সরকার। আর দুর্গাপুজো তো বটেই, দেশের মাটিতে সব আনন্দ থেকে বাদ পড়েছে সুখেনের মতো আরও প্রায় পঞ্চাশটা পরিবার। তাঁদের যে ওপাড়ে নিজস্ব জমি নেই, তাই এখন থাকতে হয়, কাঁটা তারের বেড়ার এধারে। এখানকার পরিবারগুলোর ঘরে পুজোর রাতে যখন হ্যারিকেনের আলো জ্বলে, বেড়ার ওপাড়ের মুল ভুখন্ডে দুর্গাপুজোর মন্ডপে তখন চলে নানা আলোর কারসাজি।

সুখেনের মতো এই গ্রামের সবাই বিড়ি বাঁধার কাজই করে। দিনের আলোয় সেই বিড়ি পৌঁছে দিতে হয়, বেড়ার ওপাড়ের গ্রামের মহাজনকে। এবছর সুখেন তাঁর বৌকে পুজোয় নতুন শাড়ি কিনে দেয়নি। নিজেও কিছু কেনেনি। শুধু ছেলে দুটোর জন্য দুটো জামা কিনে এনেছে হাট থেকে।

সুখেন যখন এসব ভাবছে, তখন পাশের বাড়ির কানাইকে দেখতে পেল, হাতে লন্ঠন নিয়ে কোথাও চলেছে। কানাইও সুখেনকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। কাছে এসে সুখেনের দিকে একটা বিড়ি এগিয়ে বলে, “সত্যি, কেমন সময় চলছে আমাদের! ওপাড়ে দুর্গাপুজো হচ্ছে মহা ধুমধামে। আর আমরা শালা বন্দি হয়ে থাকছি বেড়ার এপাশে। আর কতদিন যে এরকমভাবে চলবে কে জানে!”

সুখন জবাব দেয়, “শালা, আমাদের পুজোতে আমরাই আনন্দ করতে পারছি না। আজ বেড়ার গেট দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় বিএসএফ-কে বললাম, একবার রাতে গেট খুলে দিতে। দুই ছেলেকে নিয়ে গ্রামের পুজো মন্ডপে ঘুরিয়ে আনবো! কিন্তু রাজি হলো না!”

“কি হতো যদি কিছুক্ষনের জন্য গেট খুলে দিত! ছোটদের সঙ্গে আমরাও তো পুজোর আনন্দ করতে পারতাম!” কানাই বলে ওঠে।

“বিএসএফ বলে কিনা, অন্য সময়ের মতো তিনবারই গেট খুলবে। বিকালের দুঘন্টার মধ্যে যখন গেট খোলা হবে, তখনই ঠাকুর দেখে আসতে হবে। ফিরতে হবে বিকাল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে। বলতো কানু, ওই দিনের আলোতে কি লাইটিং দেখা যায়। এবার ভাবছি, পুজোর অষ্টমীর অঞ্জলীও দেবো না। কি হবে ঠাকুরের আশীর্বাদ নিয়ে! আমাদের এই দূর্দশা যেদিন দুগগা ঠাকুর ঘোচাবে, সেদিনই আমি অঞ্জলী দেবো!”

“ঠিক বলেছো সুখেনদা! আমারও তাই মত!!!!”


No comments:

Post a Comment

কবিতা -- ফিরিয়ে দাও--সৌদামিনী শম্পা

কবিতা --  ফিরিয়ে দাও সৌদামিনী শম্পা  ছেড়ে এসেছি দিনগুলো অতীতের ছায়ামাখা পথে। শান্ত শীতল দিন, ঝড়হীন, দোলাচলহীন, বড় অমলীন সে ...