Saturday, 8 October 2022

গল্পে--ভয়--প্রতিমা ভট্টাচার্য্য মন্ডল

গল্পে--

ভয়--
প্রতিমা ভট্টাচার্য্য মন্ডল

আজ ডিউটির ভীষণ চাপ।থানায় আজকে স্পেশাল রেড আছে। সারাদিন থানায় লোকজন আসার বিরাম নেই। সারাদিন পর রাত একটার সময় আমি থানায় ডিউটি শেষ করে, থানার ব্যারাকের দিকে আসছি। 
ঠিক সেই সময় দেখি একটা লাল শাড়ি পরা মেয়ে। দৌড়ে থানার পিছনের দিকে ছূটে পালিয়ে গেলো। 
আমি মনে মনে ভাবলাম কে ও ? কেন এতো রাতে থানার পিছন দিকে ছূটে পালিয়ে গেল ? কোথা থেকে আসল সে ?
 থানার পিছনের দিকে আগাছার জঙ্গলে ভর্তি। কিছু বড় বড় গাছও অবশ্য আছে। দিনের বেলায় কত সাপ, পোকামাকড় ঘুরে বেড়ায়। ঐ দিকে বড় বড় আম, বেল, চালতা, তেঁতুল, খেজুর গাছ আছে। সেই সঙ্গে ভয়ঙ্কর একটা তাল গাছও আছে। প্রতি বছর ভালোয় তাল হয়।
 কিন্তু ঐ গাছগুলোর ফল পারতেও, কেউ যায়না সাহস করে। 
মাঝে মাঝে জঙ্গল সাফ করা হয়, আবার কিছু দিন পরে যে কে সেই অবস্থা হয়ে যায়। আর ঐ দিকে একসময় কবর ছিল বলে শুনেছি। সেটাও একটা কারণ ঐ সাইটে যাওয়া এড়িয়ে যাবার জন্য। 
অনেকের মুখেই শুনেছি, তারা অস্বাভাবিক কিছু জিনিসের অনুভূতি করেছে। তার সঠিক ব্যাখ্যা হয়না। শুধু ভয়ের অনুভূতি হয়। সেই ভয় এতো তীব্র হয় যে ভয়ঙ্কর রকমের জ্বরে পড়তে হয়।
তবে এটা সত্যি বেশীর ভাগ থানা গুলোতেই ভূত আছে, ভূত নিয়ে অনেক গল্পও শোনা যায়। 

যে প্রত্যক্ষ অনুভূতি করেছে, সে বিশ্বাস করে। আর যে নিজে ব্যক্তিগত ভাবে না দেখে বা অনুভব করেছে সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। 
আমি অবশ্য বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝামাঝি থাকি। একদম অবিশ্বাস করিনা। আবার নিজে চোখে কখনও দেখিনি তাই সব ভূতের গল্প সত্যি বলেও ভাবতে পারিনি।
এই ছুটে যাওয়া মহিলাকে আগে কখনও দেখিনি। ভাবলাম কোন দরকারে কী থানায় এসেছিল, তারপর হয়তো বাথরুম পেয়েছিল তাই থানার পিছন দিকে চলে গেল। 
কিন্তু সে মহিলা এত দ্রুত আমার চোখের সামনে দিয়ে ছুটে চলে গেল যে, তাকে ডেকে কিছুই জিজ্ঞাসা করতে পারলাম না। কিছু বলতে যাওয়ার আগেই যেন চোখের বাইরে চলে গেল।
শুধু চলে যাওয়া বললে ভুল হবে।যেন হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গেলো। গাছপালা থাকলেও থানার চারিপাশে জোরালো আলো আছে। দিনের আলোর মতো সব পরিষ্কার দেখা যায়। অনেক খুঁজেও আর সেই মেয়েটি দেখতে পায়নি।

 সেই দিন রাতেই আমার খুব জ্বর হল। দুদিন ধরে ধুম জ্বর । এর মধ্যে বাড়িতে বিপদত্তারিনী পূজো হল। আমার শশুর বাড়ি ব্রাক্ষ্মণ পরিবার। বাড়ির সবাই কম বেশী অস্বাভাবিক কিছু হাওয়া বাতাস লাগলে বুঝতে পারে। 
আমার শাশুড়ি মা বললেন, "হয়তো খারাপ বাতাস লেগেছে। তাই জ্বর সারছে না।"
তারপর বাড়িতে খাঁটি ঘি দিয়ে অনেক বেশি কাঠ পুড়িয়ে হোম করে পূজো করা হয়। তারপর পূজোর ফুল আর হোমের ভস্ম দিয়ে একটা তাবিজ বানিয়ে পরিয়ে দিল আমার হাতে।

পরের দিন থেকে সুস্থ বোধ করতে লাগলাম। চারদিনের মাথায় আবার থানায় ডিউটিতে গেলাম। 
একজন অফিসার কিছু ফটো দেখছিল। আমাকে দেখে বলল, দেখো এতো সুন্দর মেয়েকে কারা মেরে কলা বাগানে ফেলে দিয়ে চলে গেছে। দেখে বিবাহিত মনে হচ্ছে। শাড়ি পরা কিন্তু শাখা সিঁদুর পরা নেয়। 
তাহলে মুসলিম বাড়ির মহিলা। বয়স খুব কম। পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট দেখলে বাকিটা বোঝা যাবে।
 আমি একটা ফটো হাতে নিয়ে ভয়ে, থরথর করে কেঁপে উঠলাম। ভয়ে আতঙ্কে আমার হাত থেকে ফটোটা নিচে মেঝেতে পরে গেল। আমার শিড়ঁদাড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। আমার রোমকূপ ভয়ে খাড়া হয়ে গেল। অফিসার বললেন, "কী হয়েছে তোমার ? শরীর খারাপ করছে?"
 আমি বললাম, "চারদিন আগে রাতের বেলায় এই মেয়েটিকে আমার সামনে দিয়ে দৌড়ে থানার পিছনের দিকে যেতে দেখেছি।" 
অফিসার বললেন," চারদিন আগে সকাল বেলায় এর বডি কলাবাগানে পাওয়া যায়। পরে বডি থানায় এনে রাখা হয়, পরে পোস্ট মর্টেমের জন্য হসপিটালে পাঠানো হয়।"
আমি মনে মনে ভাবলাম তাহলে কি আমি সেদিন ভূত দেখেছিলাম। আমার কথাটা আর স্বর হয়ে ফুটলোনা। গলার স্বর গলায় আটকে রইল ভয়ে।শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বইতে লাগল।

No comments:

Post a Comment

কবিতা -- ফিরিয়ে দাও--সৌদামিনী শম্পা

কবিতা --  ফিরিয়ে দাও সৌদামিনী শম্পা  ছেড়ে এসেছি দিনগুলো অতীতের ছায়ামাখা পথে। শান্ত শীতল দিন, ঝড়হীন, দোলাচলহীন, বড় অমলীন সে ...