Saturday, 8 October 2022

অণুগল্প -- প্রমত্ত--অগ্নিশ্বর সরকার

অণুগল্প -- 

প্রমত্ত--
অগ্নিশ্বর সরকার

 
গত কয়েকদিন ধরে একটা নতুন লোকের আবির্ভাব ঘটেছে কাঁচরাপাড়াতে। পরনে শতছিন্ন জামা-কাপড়। চুলগুলো ময়লা জমে জটা হয়ে গেছে। রাস্তাতে উদ্ভান্ত্রের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাঁধে একটা বড় বস্তা। প্রথমে স্থানীয়রা ভেবেছিল হয়তো এর অন্য কোনো মতলব থাকতে পারে, কিন্তু দু’দিন বাদেই বুঝেছে লোকটা পাগল। নিজের খেয়ালে থাকে। কিছু মানুষের সহানুভূতি দেখা দিয়েছে। তারা ওকে খাবার খাইয়েছে। কিছু মানুষ কটূক্তি করে উত্যক্ত করতেও ছাড়েনি। পাগল কিন্তু নিজের খেয়ালে মশগুল।

‘আমি কি পাগল?’ নাম না জানা, অচেনা একটা বাড়ির রোয়াকে শুয়ে নিজেকেই প্রশ্নটা করল অনিল।

অনিল আর সুনীল দুই ভাই। অনিল পড়াশোনাতে খুব ভালো ছিল। পড়াশোনার বাইরে সাংসারিক বিষয়ের ওপর একটুও আগ্রহ ছিল না; ফলতঃ সভ্যতার আদিকাল যা হয়ে আসছে তার অন্যথা হল না। বাবা-মা চোখ বোঁজার পর সমস্ত সম্পত্তির ওপর আইনত অধিকার নিয়ে জাঁকিয়ে বসল। অনিল নদীয়ার একটা হাইস্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিল। অকৃতদার মানুষ। ভাইয়ের প্রতি ছিল অসম্ভব দুর্বলতা আর ভরসা। প্রথমে শুরু হল দাদার ওপর মানসিক অত্যাচার। যখন দেখা গেল দাদা এই অত্যাচারে পাত্তাই দিচ্ছে না তখন স্ত্রীর উপদেশে শুরু হল দাদার চিকিৎসার নামে প্রহসন। ওষুধের প্রভাবে মানসিক ভারসাম্য হারাতে শুরু করল অনিল। এরপর একদিন বাড়ির জমা আবর্জনার মতো রাস্তাতে ছুঁড়ে ফেল দিল অনিলকে। শুরু হল অনিলের বেঁচে থাকার লড়াই। কোনো নাম নেই। পরিচয় নেই। স্মৃতি নেই। আছে শুধু খাবারের চাহিদা।

অনিলের স্মৃতি এখন বড্ড বেইমানি করে। এখনো খুব আবঝা মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। মনে পড়ে কিছু বইয়ের পাতা। মাঝে মাঝে মনে পড়া সেই বইয়ের লেখাগুলো ভাঙা ইঁটের টুকরো দিয়ে দেওয়ালে লেখার চেষ্টা করে। দেওয়ালের মালিক ‘পাগল’ হুংকার ছেড়ে তাড়া করে অনিলকে। ছুটি হওয়া স্কুলের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মনটা উদাস হয়ে যায়। অনিল জানে না ঠিক কেন এমন হয়। মনে করার চেষ্টা করে, কিন্তু মনে পড়ে না। কেউ খেতে দিলে খাওয়ার পর মনে হয় ‘হাতটা ধোয়া হল না তো!’ রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে খুব চেষ্টা করে আগের জীবনের কথা মনে করতে। মনে পড়ে না। স্মৃতিরা বড্ড বেইমান।

--------------------------

No comments:

Post a Comment

কবিতা -- ফিরিয়ে দাও--সৌদামিনী শম্পা

কবিতা --  ফিরিয়ে দাও সৌদামিনী শম্পা  ছেড়ে এসেছি দিনগুলো অতীতের ছায়ামাখা পথে। শান্ত শীতল দিন, ঝড়হীন, দোলাচলহীন, বড় অমলীন সে ...